পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক পালিত কন্যাকে ওয়ারিশ হিসেবে সনদ প্রদান এবং বৈধ ওয়ারিশদের ওয়ারিশ সনদ না দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার (২২ জুলাই) দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের নাম পরেশ চন্দ্র রায়। তিনি উপজেলার দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
ভুক্তভোগীরা হলেন দেবীডুবা ইউনিয়নের পেড়ালবাড়ী গুচ্ছগ্রামের মিনা, আকলিমা, রেখা খাতুন ও নাজমা আক্তার। চার বোনের পক্ষে আকলিমা ও রেখা খাতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, পেড়ালবাড়ী গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল ওহাব ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি এবং তার স্ত্রী হাজেরা বেগম একই বছরের ২৪ মার্চ মারা যান। তাদের মৃত্যুর পর চার কন্যা মিনা, আকলিমা, রেখা খাতুন ও নাজমা আক্তারই তাদের বৈধ ও আইনানুগ ওয়ারিশ।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় তিন মাস আগে তারা ওয়ারিশ সনদের জন্য দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করেন। কিন্তু চেয়ারম্যান কোনো কারণ ছাড়াই এখন পর্যন্ত তাদের ওয়ারিশ সনদ প্রদান না করে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চেয়ারম্যান ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর আব্দুল ওহাব ও হাজেরা বেগমের পালিত কন্যা খাদিজা বেগমকে তাদের প্রকৃত কন্যা ও ওয়ারিশ হিসেবে উল্লেখ করে একটি ওয়ারিশ সনদ প্রদান করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী পালিত সন্তান পালিত পিতার সম্পত্তির আইনগত ওয়ারিশ নন। এছাড়া হাজেরা বেগম ২০২৩ সালের ২৪ মার্চ মারা গেলেও ওই ওয়ারিশ সনদে তাকে জীবিত দেখিয়ে ওয়ারিশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চেয়ারম্যানের এমন কর্মকাণ্ডের কারণে তারা পিতা-মাতার বৈধ ওয়ারিশি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খাদিজা বেগমকে দেওয়া ওয়ারিশ সনদ বাতিল, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া সনদ প্রদানের অভিযোগে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের চার বোনের নামে সঠিক ওয়ারিশ সনদ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগকারী রেখা খাতুন বলেন, আমরা মরহুম আব্দুল ওহাবের বৈধ ওয়ারিশ। আমাদের ওয়ারিশ সনদ না দিয়ে আমাদের পালিত বোন খাদিজাকে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছে। গত তিন মাস ধরে চেয়ারম্যান আমাদের ঘুরাচ্ছেন। একবার বলেন, আগে একটি ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছে, এখন আর দেওয়া যাবে না। আবার বলেন, তোমাদের আরেকটি দিলে আমার নামে মামলা হয়ে যাবে।
অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত ওয়ারিশ সনদের কপিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মৃত আব্দুল ওহাবের ওয়ারিশ হিসেবে তার স্ত্রী হাজেরা বেগম, পালিত কন্যা খাদিজা বেগম এবং কন্যা মিনা, আকলিমা, রেখা খাতুন ও নাজমা আক্তারের নামে একটি ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করা হয়। সনদে ৩ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায়ের এবং ৪ ডিসেম্বর সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুজন আলীর স্বাক্ষর রয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুজন আলী বলেন, ২০২৩ সালে আব্দুল ওহাবের মৃত্যুর পর খাদিজা বেগম ওয়ারিশ সনদের জন্য আবেদন করেন। আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রে তার বাবার নাম আব্দুল ওহাব উল্লেখ ছিল। পরে এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়ায় আমি ওয়ারিশ সনদ দেওয়ার সুপারিশ করি।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালে বাকি চার বোন অভিযোগ করেন যে খাদিজা তাদের পালিত বোন। এরপর চেয়ারম্যান আমাকে বিষয়টি সরেজমিন তদন্তের দায়িত্ব দেন। বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায় মুঠোফোনে বলেন, ও (খাদিজা) যে পালিত, সেটার প্রমাণ কীভাবে করবে? ওরাই তো আবেদন করেছিল। ওয়ারিশ সনদের বিষয়ে সব দায়িত্ব মেম্বারের। মেম্বার সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার পরই সনদ দেওয়া হয়েছে।
বৈধ ওয়ারিশদের কেন এখনো ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়নি-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছে। চার বোন নতুন করে আবেদন করেছে। বিষয়টি সরেজমিন তদন্তের জন্য মেম্বারকে লিখিতভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহা বলেন, লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।








