জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত এবং এর ফলে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বজ্রপাতের এই ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর হার বহুলাংশে কমিয়ে আনতে পারে একটি বিশেষ বৃক্ষ, আর সেটি হলো ঐতিহ্যবাহী তালগাছ। বজ্রপাত নিরোধে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই গাছটি রোপণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন বজ্রপাত নিরোধে তালগাছ সবচেয়ে কার্যকর?
বিজ্ঞানীদের মতে, তালগাছ প্রাকৃতিকভাবেই একটি চমৎকার ‘লাইটিং কন্ডাক্টর’ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড হিসেবে কাজ করে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
১. উচ্চতা ও গঠন: তালগাছ সাধারণত অন্য যেকোনো গাছের চেয়ে অনেক বেশি উঁচু এবং সোজা হয়ে আকাশের দিকে বেড়ে ওঠে। এর ফলে মেঘ থেকে ধেয়ে আসা বজ্রপাত বা বৈদ্যুতিক আধান সরাসরি এই গাছের ওপর পড়ে।
২. কার্বন ও পানির আধিক্য: তালগাছের পাতা ও কণ্ডে প্রচুর পরিমাণে পানি এবং কার্বন থাকে। এটি সরাসরি মাটির সাথে সংযোগ স্থাপন করায় আকাশে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎকে কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সরাসরি মাটির নিচে (গ্রাউন্ডেড) নিয়ে যায়। ফলে আশেপাশের ঘরবাড়ি ও মানুষ বজ্রপাতের প্রত্যক্ষ আঘাত থেকে রক্ষা পায়।
৩. ঘন পাতার গঠন: তালগাছের উপরিভাগের পাতাগুলো ছাতার মতো ঘন ছড়ানো থাকে, যা আকাশের বিদ্যুৎকে সহজেই আকর্ষণ করতে পারে।
এক সময় গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে, রাস্তার পাশে ও চকের মাঠে সারি সারি তালগাছ দেখা যেত। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে আজ এই উপকারী বৃক্ষটি হারিয়ে যেতে বসেছে। তালগাছ কমে যাওয়ার কারণেই ইদানীং খোলা মাঠে কাজ করার সময় বা যাতায়াতের পথে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অন্যান্য সুবিধা
তালগাছ শুধু বজ্রপাতই ঠেকায় না, এর রয়েছে বহুমুখী গুণ। এটি মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং ঝড়ের তীব্রতা কমায়। তালের রস, গুড়, শাঁস ও পাকা তাল গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া এর পাতা দিয়ে ঘর ছাওয়া এবং তালপাখা তৈরি হয়। ঐতিহ্যবাহী বাবুই পাখিরাও এই তালগাছেই তাদের দৃষ্টিনন্দন বাসা বাঁধে।
পরিবেশবিদদের মতে, বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী ব্যাপক হারে তালগাছ রোপণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়ক, মহাসড়কের দুই পাশ, খাস জমি, ফসলের মাঠের আইল এবং নদীর তীরবর্তী এলাকায় এই গাছ রোপণ করা উচিত। একটি তালগাছ পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে ২০ থেকে ২৫ বছর সময় লাগলেও, এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতিকে সুরক্ষা দিয়ে যায়।
বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন রক্ষা করতে আজই আপনার বাড়ির আশেপাশে, ফসলের মাঠে বা রাস্তার ধারে বেশি করে তালগাছের বীজ বা চারা রোপণ করা এখন সময়ের দাবি।








