সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা ও এর ফলে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। বিশেষ করে কালবৈশাখী ঝড় ও বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতে অনেকের প্রাণহানি ঘটে। তবে একটু সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী করণীয় বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মেঘের ডাক শুনলে ঘরের ভেতরে থাকুন:
আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে বা মেঘের ডাক শোনা মাত্রই খোলা বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। পাকা দালান বা কংক্রিটের ছাদযুক্ত ঘর বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
২. খোলা মাঠ বা উচু স্থান এড়িয়ে চলুন:
বজ্রপাতের সময় কোনো অবস্থাতেই খোলা মাঠে, নদীর পাড়ে বা কোনো উন্মুক্ত স্থানে থাকা যাবে না। যদি খোলা মাঠে থাকা অবস্থায় বজ্রপাত শুরু হয় এবং আশ্রয়ের কোনো জায়গা না থাকে, তবে কোনো বড় গাছের নিচে দাঁড়ানো যাবে না। কারণ উঁচু গাছে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
৩. খোলা মাঠে আটকে পড়লে কী করবেন?
খোলা মাঠে থাকা অবস্থায় হুট করে বজ্রপাত শুরু হলে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়া যাবে না। এতে বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর চেয়ে দুই হাত দিয়ে কান ঢেকে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে গোল হয়ে (বজ্রপাতরোধী অবস্থান) থাকতে হবে, যাতে শরীরের মাটি স্পর্শ করার অংশ সর্বনিম্ন হয়।
৪. জলাশয় ও নৌকা থেকে দূরে থাকুন:
বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা, নৌকা চালানো বা সাঁতার কাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পানি বিদ্যুতের সুপরিবাহী হওয়ায় বজ্রপাতের আভাস পেলে দ্রুত পানি থেকে উঠে নিরাপদ স্থানে চলে আসতে হবে।
৫. ঘরের ভেতরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকুন:
ঝড়-বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরের সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির (যেমন- টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার) প্লাগ খুলে দেওয়া উচিত। এই সময়ে ল্যান্ডফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। বজ্রপাতের সময় জানালার গ্রিল, ধাতব পাইপ বা কল স্পর্শ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৬. গাড়ির ভেতরে থাকলে করণীয়:
বজ্রপাতের সময় যদি আপনি গাড়ির ভেতরে থাকেন, তবে গাড়ির কাচ সম্পূর্ণ বন্ধ করে ভেতরেই অবস্থান করুন। গাড়ির ধাতব বডি একটি ‘ফ্যারাডে কেজ’ হিসেবে কাজ করে, যা ভেতরের আরোহীদের সুরক্ষিত রাখে। তবে কোনো অবস্থাতেই গাড়ির ধাতব অংশ স্পর্শ করবেন না।
৭. দলবদ্ধ হয়ে থাকবেন না:
যদি কোনো খোলা জায়গায় কয়েকজন একসাথে থাকেন, তবে সবাই একসাথে গাদাগাদি করে দাঁড়াবেন না। অন্তত ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে আলাদা আলাদা হয়ে অবস্থান নিন, যাতে কেউ আক্রান্ত হলেও অন্য সহকর্মীরা দ্রুত সাহায্য করতে পারেন।
৮. বজ্রপাতে কেউ আহত হলে করণীয়:
বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কোনো বিদ্যুৎ ধরে থাকে না, তাই তাকে স্পর্শ করতে বা প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে কোনো ভয় নেই। আহত ব্যক্তিকে দ্রুত সিপিআর (Cardiopulmonary Resuscitation) দিতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত একটি তাৎক্ষণিক প্রাকৃতিক ঘটনা, যা থেকে বাঁচার প্রধান হাতিয়ার হলো পূর্বপ্রস্তুতি ও তাৎক্ষণিক সচেতনতা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত খেয়াল রাখা এবং মেঘের ডাক শুনলেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করলে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।









