গাছ আমাদের পরম বন্ধু। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে মানুষের জীবনধারণের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ সবক্ষেত্রেই বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে প্রতি বছরই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে একটি বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বা বৃক্ষমেলা সাধারণত জুন ও জুলাই মাসে আয়োজন করা হয়ে থাকে। কিন্তু কেন এই নির্দিষ্ট সময়টাকেই বৃক্ষরোপণের জন্য বেছে নেওয়া হয়?
কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জুন ও জুলাই মাসে বৃক্ষরোপণ করার পেছনে রয়েছে চমৎকার কিছু প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ। নিচে প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
১. বর্ষাকালের আগমন ও পর্যাপ্ত পানি:
জুন ও জুলাই মাসে বাংলাদেশে বর্ষাকাল বা মৌসুমী বায়ুর আগমন ঘটে। এই সময়ে নিয়মিত এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। নতুন একটি চারা গাছ রোপণের পর তার বেঁচে থাকার জন্য এবং শিকড় ছড়ানোর জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। বর্ষার বৃষ্টির কারণে চারা গাছে আলাদা করে পানি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, যা প্রাকৃতিকভাবেই চারাটির দ্রুত বেড়ে ওঠায় সাহায্য করে।
২. মাটির আর্দ্রতা ও অনুকূল তাপমাত্রা:
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহের পর জুন-জুলাইয়ের বৃষ্টিতে মাটি নরম ও আর্দ্র হয়। এই সময়ে মাটির তাপমাত্রা চারা গাছের শিকড় গজানোর জন্য একদম অনুকূল থাকে। শুষ্ক মাটিতে চারা লাগালে তা শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, কিন্তু বর্ষার ভেজা মাটিতে চারা খুব সহজেই মাটির পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে।
৩. চারা বেঁচে থাকার উচ্চ হার:
বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় জুন-জুলাই মাসে চারা রোপণ করলে তা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা (Survival rate) অনেক বেশি থাকে। প্রচণ্ড গরম বা তীব্র শীতের ধকল নতুন চারা গাছ সহ্য করতে পারে না। কিন্তু বর্ষার মেঘলা আকাশ এবং সহনীয় তাপমাত্রা চারা গাছকে কৃত্রিম প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে।
৪. শিকড়ের মজবুত ভিত্তি তৈরি:
জুন-জুলাই মাসে রোপণ করা চারা গাছগুলো বর্ষার পুরো সময়টাতে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) পর্যাপ্ত পানি ও অনুকূল পরিবেশ পায়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে যখন শুষ্ক মৌসুম বা শীতকাল আসে, ততদিনে গাছটির শিকড় মাটির অনেক গভীরে চলে যায় এবং গাছটি শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকার সামর্থ্য অর্জন করে।
৫. অর্থনৈতিক ও শ্রমের সাশ্রয়:
কৃত্রিম উপায়ে পানি সেচ দেওয়া বেশ ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। বর্ষাকালে প্রকৃতি নিজেই সেচের দায়িত্ব নেয়। ফলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পর চারাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে বাড়তি শ্রম ও অর্থের অপচয় অনেকটাই কমে যায়।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন-জুলাই মাস বৃক্ষরোপণের সর্বোত্তম সময় হলেও চারা লাগানোর ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। যেমন যেসব স্থানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে (জলাবদ্ধ এলাকা), সেখানে পানি সহনশীল গাছ লাগাতে হবে। উঁচু বা মাঝারি উঁচু স্থান, যেখানে পানি জমে থাকে না, এমন জায়গা চারা রোপণের জন্য নির্বাচন করা উচিত।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও সুন্দর পৃথিবী গড়তে জুন-জুলাইয়ের এই উপযুক্ত সময়ে আমাদের সবাইকে অন্তত একটি করে হলেও ফলদ, বনজ বা ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা উচিত।





