শূন্য পয়েন্ট থেকে গঙ্গামতি পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার বিচ ম্যারাথনের মধ্য দিয়ে কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬ দ্বিতীয় দিনে গড়াল। আজ শনিবার প্রত্যুষে এই ম্যারাথনে সাত শতাধিক অংশগ্রহণকারী ছিলেন। ম্যারাথনের পরে অনুষ্ঠিত হয় পিঠা উৎসব। রাখাইনদের ভিন্ন স্বাদের পিঠা খাওয়ায় অংশ নেন আগতরা। এছাড়া দ্বিতীয় দিনে ভলিবল, সেলিব্রেটি ক্রিকেট ও সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রয়েছে। আগামীকাল রবিবার সকালে বিচ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শেষ হবে কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল ২০২৬ উৎসব। তবে গতকালের মতো কার্নিভাল আয়োজকদের তথ্য সেন্টারটি জনশূন্য থাকায় অনেক অংশগ্রহণকারী টি-শার্ট না পেয়ে ম্যারাথনে অংশ নিতে পারেননি। তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা তাঁরা বলেন।
শনিবার দিনভর ভলিবল, সেলিব্রেটি ক্রিকেট ও সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল ভোরে সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুই দিনব্যাপী এ উৎসব।
এর আগে শুক্রবার দুপুরে কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬ ঘিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এমপি বলেছেন, ‘দেশের তথা কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে এখানে আজ থেকে শুরু হবে দুই দিনের কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কুয়াকাটাকে দেশের ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পর্যটন করপোরেশন এ উপলক্ষে আজ শুক্রবার ও শনিবার বিভিন্ন ধরনের ইভেন্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। যেখানে ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী রাখাইন সম্প্রদায়সহ দেশবরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মোট কথা কুয়াকাটার সৌন্দর্য ঐতিহ্য-ইতিহাস তুলে ধরে ব্যাপক অনুষ্ঠানমালা থাকছে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এটি বিশেষ পরিকল্পনার একটি। তিনি ক্ষোভ তুলে বলেন, বিগত সরকার গেল নয় বছরে কুয়াকাটাতে তুলে ধরতে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা কিংবা কার্নিভাল করেনি। একবার করেছিল তা নিয়ে দুর্নীতির অন্তহীন অভিযোগ তখনকার সময়ে গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছিল। তাই বর্তমান বিএনপি সরকার কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।’ মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত কুয়াকাটার খান প্যালেস আবাসিক হোটেল কনফারেন্স কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব বলেন।
তিনি এসময় দেশের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. সামীমুজ্জামান এই সভায় সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এমপি, পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, পিরোজপুরের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ, বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান, পটুয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি। এ সময় পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করিম, পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবু ইউসুফসহ বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলার বিএনপির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়কের প্রকল্পটি ৩ নভেম্বর একনেক সভায় উঠবে। এটা পাশ হয়ে গেলে ৩-৪ বছর লাগার কথা নয়, সর্বোচ্চ ২-৩ বছরের মধ্যে সড়ক উন্নয়নের কাজ শেষ হওয়ার কথা। এ সড়কটির কাজ বাস্তবায়ন হলে কুয়াকাটার জন্য বিরাট সম্ভাবনা তৈরি হবে।’
মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এমপি বলেন, ‘বর্তমান সরকার সকল কর্মকাণ্ড মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে গ্রহণ করেছে। এতে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা কমবে। কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক প্ল্যানার দিয়ে পরিকল্পনা করে সাজানোর পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি।’
শুক্রবার বিকেলে কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। মূলত: বিচ ফুটবল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী কুয়াকাটা কার্নিভাল-২০২৬ এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬ উদযাপনকে ঘিরে সব ধরনের নিরাপত্তা নেওয়া হয়।
স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন জানান, তিনি নিজে থেকে গত পাঁচদিন ধরে সবকিছু তদারকি করছেন কার্নিভাল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের লক্ষ্যে। কার্নিভালকে ঘিরে এখন কুয়াকাটায় বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। গোটা কুয়াকাটা এখন পর্যটকে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। সর্বত্র পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে আছে।
এর আগে গতকাল শুক্রবার রাতে চিত্রনায়িকা পূর্ণিমার স্টেজ শো, চিশতী বাউল ও প্রীতম হাসানের সংগীত, সাদ্দাম মালের কমেডি শো এবং দিনভর ঘুড়ি উৎসব, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও বিচ ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে পর্যটন কার্নিভাল ঘিরে প্রত্যাশা অনুযায়ী কুয়াকাটায় আসা লাখো পর্যটক ও দর্শনার্থীরা আবাসিক ও খাবার হোটেলের ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বহু পর্যটক সোশ্যাল মিডিয়ায় তিক্ত অভিব্যক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এছাড়া কুয়াকাটা শহর ও আশপাশের পর্যটন স্পটে চলাচল করা অটোবাইক, অটোভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভাড়া নেওয়া হয়েছে দ্বিগুণ থেকে চারগুণ বেশি। এনিয়ে মানুষ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ রয়েছে। এছাড়া খাবার হোটেলে পচা-বাসি খাবার বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। গলাকাটা দাম তো আছেই। পর্যটকের সঙ্গে এনিয়ে অনেক ব্যবসায়ী খারাপ আচরণ করেন। নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ঝেড়েছেন।
আগতদের অনেকে বলেছেন, আয়োজকরা অতিথি ম্যানেজমেন্টে সবাই ব্যস্ত ছিলেন। মূল অতিথি, পর্যটক-দর্শনার্থী সেবা নিয়ে সবাই ছিলেন উদাসীন। ইসমাইল হাসান নামের এক পর্যটক বলেন, ‘আমরা পর্যটকরা এখানকার মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের অতিথি নই, শিকারে পরিণত হয়েছি।’ অনেক দর্শনার্থীকে রাতে সৈকতের পাশে বেলাভূমে রাত কাটাতে দেখা গেছে।
এমনকি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাঠ নির্ধারণ নিয়ে গেস্ট (পর্যটকরা) ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি লাখো দর্শনার্থী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ১৫-২০ হাজার মানুষের সংকুলানের মতো একটি মাঠ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠকরা অভিযোগ তুলেছেন, যে তাঁদের সঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাস্তবায়ন করা হয়েছে আয়োজকদের নিজস্ব পলিসিতে।









