সমুদ্রসৈকত, ঝাউবন, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত আর উপকূলীয় প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে কুয়াকাটা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। এবার সেই পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে গঙ্গামতিতে ৩ দশমিক ৬৮ একর খাস জমিতে গড়ে উঠতে পারে পরিবেশবান্ধব, পরিবারকেন্দ্রিক ও প্রকৃতিনির্ভর একটি সমন্বিত পর্যটনকেন্দ্র।
সেখানে থাকবে প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ, শিশুদের বিনোদন ও প্রকৃতিশিক্ষা, ঝাউবনের মধ্যে হাঁটার পথ, পর্যটকসেবা, স্থানীয় রাখাইন খাবার ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। প্রস্তাবিত ধারণাটি বাস্তবায়িত হলে গঙ্গামতি শুধু সমুদ্রসৈকত দেখার একটি স্থান হিসেবে নয়, বরং প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী, পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উপকূলীয় সৌন্দর্যের সমন্বিত অভিজ্ঞতার একটি নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
প্রস্তাবনায় প্রকল্পটিকে সাধারণ অর্থে কোনো ‘চিড়িয়াখানা’ না বানিয়ে ‘Nature-Based Tourism Destination’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক সরকারের এমন প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
গঙ্গামতির প্রস্তাবিত এলাকায় সামনের অংশে রয়েছে ঝাউবন ও সমুদ্রসৈকত। ঝাউবনের মধ্য দিয়ে প্রবেশপথ তৈরি করে পর্যটকদের জন্য পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন সুবিধা গড়ে তোলার ধারণা রয়েছে। প্রকৃতির ক্ষতি না করে হাঁটার পথ, বসার স্থান, ছায়াযুক্ত বিশ্রাম এলাকা, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত উপভোগের জায়গা তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। মূল নীতি হতে পারে—‘প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়ন নয়, প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই উন্নয়ন।’
প্রস্তাবিত পর্যটনকেন্দ্রের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে হরিণ এলাকা। প্রাকৃতিক পরিবেশসমৃদ্ধ শেড ও এনক্লোজার তৈরি করে সেখানে হরিণের চলাচল, ছায়া, নিরাপদ পানি, খাবার ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে প্রাণী প্রদর্শনের চেয়ে প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হতে পারে ‘Animal Rescue & Care Zone’। বিভিন্ন কারণে বিপদগ্রস্ত বা উদ্ধার করা প্রাণীর অস্থায়ী পরিচর্যা, নিরাপদ আবাস, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে পারে এই কেন্দ্রে। একই সঙ্গে এটি পর্যটকদের জন্য প্রাণী ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির একটি শিক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারে।
পরিবার ও শিশুদের জন্য আলাদা ‘Kids & Family Zone’ রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। বয়সভেদে নিরাপদে খেলাধুলা, ছোটদের রাইড, প্রকৃতিবিষয়ক শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং প্রাণী-পাখি সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকলে পরিবার নিয়ে কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের জন্য গঙ্গামতি হয়ে উঠতে পারে বাড়তি আকর্ষণের জায়গা। এতে শিশুদের বিনোদনের পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে তাদের পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
গঙ্গামতির পর্যটন সম্ভাবনাকে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগও রয়েছে। প্রস্তাবনায় স্থানীয় রাখাইন খাবার, ঐতিহ্যবাহী পণ্য, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা নিয়ে ‘Rakhine Food & Cultural Corner’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এতে পর্যটকরা সমুদ্র ও প্রকৃতির পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতির স্বাদ নিতে পারবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, খাবারের ব্যবসা, হস্তশিল্পী ও সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
প্রস্তাবনায় গঙ্গামতিকে বিচ্ছিন্ন কোনো পর্যটন স্পট হিসেবে না দেখে কুয়াকাটার বৃহত্তর পর্যটন সার্কিটের অংশ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। গঙ্গামতি, ঝাউবন, সমুদ্রসৈকত, চর বিজয়, রাখাইন সংস্কৃতি ও আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোকে যুক্ত করে একটি ‘Integrated Tourism Circuit’ তৈরি করা গেলে পর্যটকরা একই সফরে একাধিক আকর্ষণ উপভোগ করতে পারবেন। এতে গঙ্গামতি এলাকায় পর্যটকদের অবস্থানকালও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্রকে ঘিরে পর্যটননির্ভর নানা কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। খাবারের ব্যবসা, পরিবহন, স্থানীয় পণ্য বিক্রি, হস্তশিল্প, গাইডিং সার্ভিস ও বিনোদনসেবার মতো খাতে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়তে পারে। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির সুফল শুধু পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবনায় ভবিষ্যতে পর্যটকের চাপ ও প্রকল্পের কার্যকারিতা বিবেচনা করে ধাপে ধাপে এর পরিধি বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৩ দশমিক ৬৮ একর এলাকায় মূল প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরে পর্যটন চাপ ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন ও অনুমোদন সাপেক্ষে আশপাশের সরকারি জমিতে সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। জলভিত্তিক বিনোদন, অতিরিক্ত প্রকৃতি এলাকা ও অন্যান্য পর্যটন সুবিধা ভবিষ্যতে যুক্ত করার সম্ভাবনাও রাখা হয়েছে।
তবে গঙ্গামতির মতো উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রস্তাবনায় স্পষ্ট করা হয়েছে। বড় ও ভারী স্থাপনার পরিবর্তে সীমিত, পরিবেশবান্ধব ও ঝুঁকি-সহনশীল অবকাঠামো তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান ঝাউবন ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন এবং উপকূলীয় দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের নকশা করার সুপারিশ রয়েছে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের আগে জমির মালিকানা, খতিয়ান, দাগ, শ্রেণি, দখল, সরকারি রেকর্ড, পরিবেশগত বিষয় এবং প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমোদন যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে যাচাই-বাছাই ও সরকারি অনুমোদনের পর ধাপে ধাপে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার ধারণাই প্রস্তাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
সবকিছু ঠিকঠাকভাবে এগোলে গঙ্গামতি কুয়াকাটার পর্যটন মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী, শিশুদের শিক্ষা-বিনোদন, রাখাইন সংস্কৃতি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে একই কাঠামোয় যুক্ত করার এই উদ্যোগ কুয়াকাটাকে শুধু সৈকতনির্ভর পর্যটনকেন্দ্রের পরিচয় থেকে বের করে আরও বৈচিত্র্যময় পর্যটন গন্তব্যে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা গেলে গঙ্গামতি ভবিষ্যতে কুয়াকাটার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘Nature, Wildlife & Family Tourism Destination’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
সেখানকার ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহিম জানান, সরকারের এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে পর্যটনপল্লী গঙ্গামতির দৃশ্যপট বদলে যাবে। বাড়বে পর্যটকের ভিড়।









