ঘরবাড়ি-জমি হারানো ছয় শতাধিক পরিবারের অধিকাংশই কর্মহীন ॥ শতাধিক ঘর ভাড়া, তালাবদ্ধ মার্কেটের দোকান
পায়রা বন্দরে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন পল্লী মহল্লাপাড়া আবাসনের ৬২৮ পরিবারের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অন্তত এক শ পরিবার পুনর্বাসনের ঘর ভাড়া দিয়ে কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেছেন। একসময় এসব পরিবারের অধিকাংশই কৃষি ও জেলে পেশানির্ভর ছিল। জমিজিরেত, খাল-পুকুর-জলাশয় হারিয়ে এসব পরিবার এখন দুরবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
পেশায় সংকট চললেও তাদের মিলছে না কর্মসংস্থান। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক পরিবারের কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিলেও বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে বেকার পরিবারগুলোর জীবনে চরম দুরবস্থা নেমে এসেছে। চলছে টানাপোড়েন। একসময় তেল ছাড়া অন্য কিছুই তাদের কিনতে হতো না। এখন পানি থেকে শুরু করে সবকিছুই কিনতে হয়।
১২ মাস কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন কিংবা কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকা মানুষগুলো কর্মস্থল হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন। ২০২১ সালের পর থেকে এসব পরিবারের অনেকেই মূলত কর্মহীন হয়ে আছেন। অনেকে কষ্ট করে ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছেন। কিন্তু তাতেও সংসারের খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষতিপূরণের যে পরিমাণ টাকা তারা পেয়েছেন, তাও অধিকাংশেরই খরচ হয়ে গেছে। অনেকে আবার এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার জন্য ঘুরছেন।
মোট কথা, এক মহাসংকটে দিন পার করছেন এসব পরিবারের অধিকাংশ মানুষ। চোখে না দেখলে কিংবা কথা না বললে এসব মানুষের সমস্যা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।
সরেজমিনে গেলে আবাসনের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান তালুকদার (৬২) জানান, ধঞ্জুপাড়া গ্রামে ছিল তার সাজানো-গোছানো বাড়িঘর। ছিল ফসলি জমি। মাছ চাষ করতেন। গবাদিপশু পালন করতেন। করতেন কৃষিকাজ। ৩২ বিঘা জমির মালিক এই মানুষটি এখন মহল্লাপাড়া আবাসনের ‘এ’ টাইপের ১৩৫ নম্বর একতলা ভবনে থাকছেন। ২০২২ সালের পর থেকে যেন ঘরটিতেই বন্দি হয়ে আছেন। ঘরটি ছাড়া এক শতক জমিও নেই। আয় বলতে তিন কক্ষের ঘরটির সামনে টিনের বেড়া ও ছাপড়া দেওয়া ছোট্ট দোকানটি।
তিনি বলেন, জমির ক্ষতিপূরণের সব টাকা এখনো তুলতে পারেননি। যা পেয়েছিলেন, সব শেষ। একসময় তেল ছাড়া কিছুই কিনতে হতো না। আর এখন পানি পর্যন্ত কিনতে হয়। মানুষটি দিশেহারা হয়ে আছেন। জমির ক্ষতিপূরণের যে পরিমাণ টাকা তুলেছেন, তাতে এলও অফিসের দালালকে ৬-৭ শতাংশ ঘুষ দিতে হয়েছে। বাকি টাকার আশা ছেড়ে দেওয়ার কথা ব্যক্ত করেন তিনি।
কৃষক পেশার এই মানুষটি প্রায় পাঁচ বছর পেশা হারিয়ে এখন দোকানি হয়েছেন। কিন্তু চোখে সব অন্ধকার দেখছেন। জীবিকার চাকা সচল রাখতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘এখন আর কোনো পুঁজি নেই। পায়রা বন্দরও চালু হয় নাই। মাঝখান দিয়ে জমিজমা-বাড়িঘর হারাইয়া নিঃস্ব হইয়া গ্যালাম।’
তার দাবি, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মসংস্থানের জন্য রাজমিস্ত্রির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু তা কোনো কাজে লাগেনি। হাবিবুর রহমানের আরও অভিযোগ, পায়রা বন্দর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এই আবাসনে ৬২৮ পরিবারের জন্য ঘর বরাদ্দ দিয়েছে। মসজিদ করেছে, স্কুল করেছে, কবরস্থান করেছে। কর্মসংস্থানের জন্য ১০ কক্ষের একটি মার্কেটও করেছে। কিন্তু ওই দোকানগুলো যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক হয়নি।
দেখালেন, সবকটি দোকান বন্ধ। তালা ঝুলছে। কেউ দোকান করেন না। প্রকৃতপক্ষে যাদের ব্যবসা করার সুযোগ আছে, তাদের কাউকেই দোকান দেওয়া হয়নি বলে অধিকাংশের অভিযোগ।
এমনকি বর্তমানে ঘরটির কী অবস্থা—জিজ্ঞেস করায় তার ভাষ্য, ‘এয়াতো এহনই ফাইট্যা চিইর্যাগেছে।’ অর্থাৎ ঘরটি নষ্ট হয়ে গেছে। বহু ঘরের ছাদ ড্যাম হয়ে গেছে। মেরামত করা দরকার। তবে বর্তমানে ঘরের দলিল পাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
‘এ’ টাইপের ১২১ নম্বর ঘরে বসবাস করছেন মির্জাগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মনিরা আক্তার ও সাইদুল দম্পতি। তারা এই ঘরটিতে ভাড়ায় থাকেন। যার নামে ঘরটি বরাদ্দ ছিল, সেই গিয়াস উদ্দিন পল্লান ছিলেন মুন্সীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পর তিনি বা তার পরিবারের কেউ এখানে থাকেননি।
মনিরা আক্তার জানান, তিনি নিজে দোকান করেন। সেলাই মেশিনে কাজ করেন। সংসারে স্বামীর সঙ্গে এভাবে যোগান দেন। স্বামী সাইদুল আগে পায়রা বন্দরে কাজ করতেন। এখন এখানে কাজ নেই, তাই ঢাকায় গিয়ে কাজ করছেন। তিনি ক্যারেন অপারেটরের কাজ করেন।
বড় পাঁচ নম্বর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন পলাশ খান। এখন মহল্লাপাড়া আবাসনের বাসিন্দা। ‘এ’ টাইপের ১০৭ নম্বর ঘরে বসবাস করেন তিনি। ছয়জনের সংসার। বাবা-মা এখনো অন্যত্র থাকেন। সবাই একত্রে বাসায় আসলে জায়গার সমস্যা হয়।
পলাশ খান জানান, মাত্র ১০ হাজার টাকা শতকপ্রতি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। তাও নয় বিঘা জমির টাকা তুলতে পারেননি। উল্টো ঘুরতে ঘুরতে জমানো টাকা নষ্ট করেছেন। প্রচণ্ড ক্ষোভ এই মানুষটির মনে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন মাছ খেতেন। চাল-ডাল-মাছ কিছুই কিনতে হতো না। এখন নিঃস্ব। সব শ্যাষ। এখন খাইয়া লইয়া কেমনে বাচুম, তা বুঝতে পারছি না।’
এমনকি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার বিদ্যুৎ বিলও ঠিকমতো দিতে পারছেন না। কষ্টের যেন শেষ নেই মানুষটির।
‘বি’ টাইপের ২৩৯ নম্বর ঘরের বাসিন্দা এখন জুলেখা বেগম ও সৈয়দ মৃধা দম্পতি। প্রবীণ এই দুই মানুষ বলেন, ‘বানাতিপাড়ায় থাকতাম। ওখানে কাজকাম করতাম। ভেড়া পালতাম। হাক (শাক)-পাতা টোহাইয়া খাইতাম। এহন সব কেনা লাগে।’
তারাও জানান, ‘তখন পোর্ট বুঝি নাই। বুঝছিলাম, আমাদের ভাগ্য ফিরবে। কিন্তু হলো উল্টোটা।’ যতটুকু কৃষিজমি ছিল, তার টাকা এখনো পাননি। এখন এই দম্পতি পুরো বেকার। কোনো আয় নেই।
একই কষ্টের কথা জানান ‘বি’ টাইপের ঘরের বাসিন্দা মজনু হাওলাদার। এভাবে মহল্লাপাড়া আবাসন পুনর্বাসন পল্লীর ৬২৮ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের বেহাল দশা। বেকারত্ব মানুষগুলোকে অস্থির করে তুলেছে। যেন দিশেহারা হয়ে গেছেন তারা।
এমনকি অন্তত ১০০ পরিবার তাদের বরাদ্দের ঘর ভাড়া দিয়ে চলে গেছে। তারা অন্যত্র থাকেন। বর্তমানে আবাসনের বাসিন্দাদের অধিকাংশের কোনো কাজ নেই। বাড়িঘরের ক্ষতিপূরণের টাকাও শেষ হয়ে গেছে। পোর্টকেন্দ্রিক তাদের কর্মসংস্থানের ছয় বছর আগের সেই স্বপ্নগুলো এখন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে জীবন-জীবিকার যোগানের দুশ্চিন্তায়।
লালুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস জানান, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ তখন বলেছিল, এই ঘরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উপহার দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের বন্দর এলাকায় কর্মসংস্থানের কথা ছিল।
উল্টো কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যেসব ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা ছিল অবাস্তব এবং বহুলাংশে অর্থহীন। এসব ঘর নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে করা হয়েছে। বিশেষ করে ছাদগুলো এখনই সংস্কার করা প্রয়োজন। কিন্তু যারা থাকছেন, তারা তো পেটের যোগানই দিতে পারছেন না। ঘর মেরামত করবেন কীভাবে?
অনেকে ঘর ভাড়া দিয়েছেন। কেউ কেউ বিক্রি করেছেন। কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলেও জানান তপন বিশ্বাস।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ ব্যাপারে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘অবকাঠামোগত সহায়ক সুবিধাসমূহের উন্নয়ন’ (ডিআইএসএফ—Development of Infrastructure Support Facilities) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ওই আবাসনের বাড়িগুলো বরাদ্দপ্রাপ্ত জনগণের ব্যক্তিগতভাবে মেরামত করার নিয়ম রয়েছে।
দোকান বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, বন্দরের স্টেট বিভাগ থেকে একাধিকবার দোকান বরাদ্দের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আবাসনের বাসিন্দারা নামমাত্র ভাড়ার বিনিময়ে দোকান বরাদ্দ নিতে আগ্রহী ছিলেন না।









