পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা আব্দুর রশিদ খান ডিগ্রি কলেজের রেজুলেশন বই গায়েব করে এবং সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষর জাল করে বর্তমান অধ্যক্ষ আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে ২০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া নানা অনিয়মের অভিযোগে অধ্যক্ষ আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে বুধবার দুপুর ১২টার দিকে কলেজের একটি কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেছেন পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. নাসির উদ্দিনসহ স্থানীয় অভিভাবকেরা।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালে এটি এমপিওভুক্ত হয়। ১৯৯৫ সালের ১৫ জুলাই কলেজটির অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান আবুল কালাম আজাদ। প্রথমে কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে স্নাতক শাখায় শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি লাভ করে কলেজটি। ২০১৫ সাল পর্যন্ত স্নাতক শাখায় ২৯ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় তাঁরা সবাই করোনাকালীন সময়ে সরকারিভাবে পাঁচ হাজার টাকা করে ভাতা পেয়েছিলেন।
২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ অবসরে যান। এরপর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওই কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবদুল মালেক। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট দলীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে তিনি অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ লাভ করেন।
আবদুল মালেক তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার একেএম নূরুল হুদার আপন ভাগ্নিজামাতা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের ‘ম্যানেজ’ করে চাকরিতে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ওই কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. ইউনুচ মৃধা বলেন, স্নাতক শাখায় যে ২৯ জন শিক্ষক করোনাকালীন ভাতা পেয়েছিলেন, তাঁরাই বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক। কিন্তু হঠাৎ করে তাঁরা দেখতে পান, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে প্রভাষক পদে লেমন রায়, ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে প্রভাষক পদে মো. মাসুদ এবং লাইব্রেরিয়ান পদে মো. বাহাউদ্দিন নামে তিনজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হয়েছেন। এরপর থেকে তাঁরা কলেজে আসছেন। এমপিওভুক্ত হওয়ার আগে তাঁরা কোনোদিন কলেজেও আসেননি। করোনাকালীন ভাতাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তালিকাতেও তাঁদের নাম ছিল না।
কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. নাসির উদ্দিন বলেন, মো. আসাদুজ্জামান নামে এক শিক্ষককে ২০০৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর স্নাতক শাখার ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি যোগদান করেন এবং করোনাকালীন ভাতাও পেয়েছিলেন। অথচ তাঁকে বাদ দিয়ে একই বিষয়ে মোছা. নাছিমা নামে আরেকজনকে সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের স্বাক্ষর স্ক্যান করে ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি করোনাকালীন ভাতা পাননি।
তিনি আরও বলেন, অধ্যক্ষ আবদুল মালেক কলেজের গভর্নিং বডি গঠনেও স্বেচ্ছাচারিতা করছেন। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলম তালুকদারসহ স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের কোনো কথাই তিনি শুনছেন না। নিজেকে রক্ষা করতে তিনি দুই বছর পর্যন্ত এডহক কমিটি করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কলেজের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের সময়ের নিয়োগসংক্রান্ত রেজুলেশন বই গায়েব করে নতুন রেজুলেশন তৈরি এবং সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষর জাল করে বর্তমান অধ্যক্ষ আবদুল মালেক স্নাতক শাখার বিভিন্ন পদে অন্তত ২০ জনকে নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
স্নাতক শাখার প্রভাষক আবদুর রহিম বলেন, তিনি বৈধভাবে নিয়োগ পেয়ে শিক্ষকতা করছেন এবং করোনাকালীন ভাতাও পেয়েছিলেন। অথচ তাঁর নাম এমপিওভুক্তির জন্য পাঠানো হচ্ছে না। একই অভিযোগ করেন রসায়ন বিষয়ের শিক্ষক মো. লিটন ও ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান।
এ ছাড়া কলেজের তিন শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির গাছ বিক্রি করে কলেজের কোষাগারে অর্থ জমা না দিয়ে সাত থেকে আট লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অধ্যক্ষ আবদুল মালেক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ স্যারের নিয়োগ দেওয়া ব্যক্তিরাই এমপিওভুক্ত হচ্ছেন। স্যারের স্বাক্ষর জাল করে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। করোনাকালীন ভাতাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বাদ দিয়ে কীভাবে অন্য শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে সবাই এমপিওভুক্ত হবেন।
নতুন রেজুলেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রেজুলেশন বই হারিয়ে গেছে। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে নতুন রেজুলেশন বই কেনা হয়েছে।
যদিও সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বর্তমান অধ্যক্ষ আবদুল মালেকের স্বাক্ষরিত এমপিওভুক্ত ও এমপিওবহির্ভূত ৬৮ জন শিক্ষকের তালিকার মধ্যে ২০ জনের নামের পাশে ‘ভুয়া নিয়োগ’ বলে উল্লেখ করেছেন।









