স্বামীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা করেছিলেন স্ত্রী ফাতেমা বেগম। সেই মামলার এক আসামির মায়ের করা পাল্টা মামলায় এবার নিজের ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ সাত দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে তাঁকে। এ সময় তাঁর অপর দুই সন্তানকে থাকতে হয়েছে এতিমখানায়।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমের এই ঘটনায় পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। প্রতিবেদনে তিনজনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তাঁদের দাবি, তাঁরা ওই মামলায় কোনো সাক্ষ্যই দেননি। এমনকি তাঁদের নাম সাক্ষী হিসেবে কীভাবে এসেছে, সেটিও তাঁরা জানেন না।
ফাতেমা বেগমের স্বামী মুহাম্মদ কাশেম পেশায় জেলে ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কুতুবজোমের কবির বাজার এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরদিন ফাতেমা মহেশখালী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মো. রাসেল।
হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাসেলের বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। তবে ফাতেমার দাবি, পরবর্তী সময়ে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ৬ মে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।
এরপর রাসেলের মা নুর জাহান বেগম ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট আদালতে ফাতেমাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্ত করেন মহেশখালী থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম। ১০ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
তবে প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে থাকা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের প্রত্যেকের দাবি, তাঁরা কোনো সাক্ষ্য দেননি। তাঁদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনাও ঘটেনি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও একই দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, কাশেম হত্যার পর তাঁর পরিবারকে চাপে রাখা এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফাতেমার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, আদালতে দেওয়া অভিযোগের ক্ষেত্রে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে গত ৩১ আগস্ট রাতে ফাতেমা, তাঁর শাশুড়ি রাশেদা বেগম ও নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে রাশেদা ও নাছিমা জামিন পান। তবে ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
অবশেষে সোমবার মহেশখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইনের আদালত ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেন। এক হাজার টাকা বন্ডে জামিন পাওয়ার পর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
ফাতেমার ছোট তিন কক্ষের ঘর। স্বামীকে হারানোর পর শাশুড়ি ও তিন সন্তানকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করছিলেন তিনি। মা কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর দুই মেয়েকে এতিমখানায় রাখা হয়েছিল।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামালও দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে এলাকায় কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। তাঁর মতে, কাশেম হত্যার পর উত্তেজিত লোকজন রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিল। পাল্টা মামলার কারণে স্বামীহারা ফাতেমাকে ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ কারাগারে যেতে হয়েছে।









