এক সময় বর্ষা শেষে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার শুঁটকি চাতালগুলোতে শুরু হতো কর্ম ব্যস্ততা। চলনবিলসহ আশপাশের নদী, খাল-বিল ও মুক্ত জলাশয় থেকে আসা দেশি মাছে ভরে উঠত চাতাল। মাছ পরিষ্কার করা, মাচায় শুকানো এবং শুঁটকি তৈরির কাজে দিনভর ব্যস্ত থাকতেন শ্রমিকেরা। উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারেও পৌঁছে যেত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। দেশি মাছের সংকট, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে মাছ শিকারের প্রভাবে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে চলনবিল বেষ্ঠিত ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প।
মাছের অভাবে উপজেলার অধিকাংশ শুঁটকি চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা একমাত্র চাতালেও সীমিত পরিসরে চলছে উৎপাদন। এতে কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা, অন্যদিকে মাছ সংগ্রহ করতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। একসময় যে চাতালগুলো ঘিরে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হতো, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। দীর্ঘদিনের এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
সম্প্রতি চলনবিলের কলকতি এলাকার একটি শুঁটকি চাতালে গিয়ে দেখা যায়, অল্প কিছু মাছ নিয়ে শুকানোর কাজ করছেন শ্রমিকেরা। মাছের সরবরাহ কম থাকায় কাজের পরিধিও সীমিত। অধিকাংশ চাতাল বন্ধ থাকায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করা শ্রমিকদের আয়-রোজগারে টান পড়েছে।
শুঁটকি ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন সমকাল‘কে জানান, আগে নিয়মিত মাছ পাওয়া গেলেও চলতি মৌসুমে অনেক ব্যবসায়ী টানা দুই সপ্তাহেও মাছ সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে চাতাল বন্ধ রেখেছেন। তাঁর মতে, চলনবিল এলাকায় অপরিকল্পিত পুকুর খনন, অবৈধ জালের ব্যবহার ও নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে দেশি মাছের সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আছান আলী ও সুজন শেখসহ কয়েকজন জানান, একসময় বর্ষা মৌসুমে চলনবিলসহ ভাঙ্গুড়ার ছোট-বড় বিল পানিতে টইটম্বুর থাকত। নদী ও খাল দিয়ে মাছ বিভিন্ন জলাশয়ে বিচরণ করত। জেলেরা এসব জলাশয় থেকে প্রচুর দেশি মাছ আহরণ করতেন। সেই মাছের একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হতো শুঁটকি চাতালগুলোতে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি অন্তত ২০টি দেশে রপ্তানি হতো। তবে রপ্তানির এই তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
শুঁটকি চাতালের শ্রমিক আসমা খাতুন বলেন, “আগে চাতালে কাজের অভাব ছিল না। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতো। এখন মাছ না থাকায় অধিকাংশ দিন কাজই থাকে না। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে গেছে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদী, খাল ও বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া দেশি মাছের প্রাপ্যতা হ্রাসের অন্যতম কারণ। অপরিকল্পিত বাঁধ, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে কোথাও কোথাও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চায়না দুয়ারি, বাদাই জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার। এসব জালে মা মাছের পাশাপাশি রেণু ও পোনা মাছও ধরা পড়ায় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কলকতি এলাকার শুঁটকি চাতালের মালিক মো. দুলাল হোসেন বলেন, “দিলপাশার, পুইবিল, আদাবাড়িয়া, বাঁশবাড়িয়া ও দত্তখারুয়া বিলে একসময় প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মা মাছসহ সব ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে দেশি মাছের উৎপাদন ও প্রজনন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শুঁটকি উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
একসময় চলনবিলের মুক্ত জলাশয়ে মাগুর, চাপিলা, শিং, পাবদা, টাকি, চিতল, রিটা, আইড়, কৈ, বোয়াল, খৈলসা, দেশি সরপুঁটি, গজার, বাইম, তিতপুঁটি, বাঘাইড়, গুলশা, কাজলি, টেংরা, মলা ও শোলসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এসব মাছ ছিল স্থানীয় মানুষের খাদ্য, জীবিকা ও শুঁটকি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমানে অনেক প্রজাতির মাছ আগের তুলনায় কম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়ের দেশি মাছনির্ভর শুঁটকি শিল্পও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল মোল্লা বলেন, “চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে মাছ নিধন এবং বৃষ্টি কম হওয়ায় জলাশয়ে পানি ও মাছ দুটোই কমেছে। অন্যান্য বছর যেখানে তিনটি শুঁটকি চাতাল ছিল, সেখানে এবার রয়েছে মাত্র একটি। গত বছর ৭ টন শুঁটকি উৎপাদন হলেও এ বছর ৪ থেকে ৫ টন উৎপাদন করাও কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, দেশি ও বিদেশি বাজারে শুঁটকির চাহিদা থাকলেও জলাশয়ে পর্যাপ্ত মাছ না থাকলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, জলাশয়ের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত এবং মৎস্যজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
মৎস্য কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৭০৩টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল ধ্বংস করা হয়েছে। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।









