সড়ক-ড্রেনেজ, নিরাপদ পানি ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে একাধিক প্রকল্প; পর্যটন বিকাশে ওয়াচ টাওয়ার, ওয়াকওয়ে ও সৌরবিদ্যুতের দাবি
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলছে। সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, সাইক্লোন শেল্টার, খাল পুনঃখনন, ফুটপাত ও সৌন্দর্যবর্ধনসহ বিভিন্ন খাতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে একাধিক প্রকল্প। এসব কাজ সম্পন্ন হলে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার অবকাঠামো ও নাগরিকসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পর্যটননগরীকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ওয়াচ টাওয়ার, পর্যটকবান্ধব ওয়াকওয়ে ও সৌরবিদ্যুৎচালিত সড়কবাতি স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
একদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি, অন্যদিকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য—এর সঙ্গে রয়েছে রাখাইন সংস্কৃতি, লেম্বুর বন ও কচ্ছপখালী খালের মতো প্রাকৃতিক আকর্ষণ। এসব কারণে কুয়াকাটায় পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে নিরাপদ পানি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও অন্যান্য নাগরিকসেবার চাহিদাও। এই পরিস্থিতিতে কুয়াকাটা পৌরসভায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে পর্যটননগরীর ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের (সিটিসিআরপি) আওতায় ১২০ কোটি টাকা, ইউআইআইপি কুয়েত প্রকল্পে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, এসইউইউআইডিপি প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) মাধ্যমে ৪৮ কোটি টাকার কাজ রয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও কিছু কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং কয়েকটি কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
সড়ক, ড্রেনেজ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় উন্নয়ন
সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হচ্ছে। পরিবেশগত প্রশমন কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ইউনিব্লকের মাধ্যমে প্রায় পৌনে চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে। রাখাইন পল্লি কেরানীপাড়ার অভ্যন্তরে ৪৮৫ মিটার আরসিসি রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে দেড় কোটি টাকা। এ ছাড়া ৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার ২৪৫ মিটার সড়কে বিটুমিনাস কার্পেটিং করা হচ্ছে।
উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় পাঞ্জুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনতলাবিশিষ্ট সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার ৬৭৩ টাকা। মীরাবাড়ি মাদ্রাসায় একই ধরনের সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৫৩৯ টাকা।
পাশাপাশি প্রায় ৮০০ মিটার সড়কের আরসিসি নির্মাণকাজ চলছে। ৩ কিলোমিটার ৭১০ মিটার আরসিসি ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। তিনটি আরসিসি আর্চ ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা। দুটি আবাসনে ৫৮৮ মিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৮০ লাখ টাকা।
কচ্ছপখালী খাল ঘিরে পর্যটন বিকাশের পরিকল্পনা
কুয়াকাটার পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে কচ্ছপখালী খালকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা। পৌর প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানান, প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এ খাল পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে, বেঞ্চ ও ঘাটলা নির্মাণ, প্যাডেল বোট সরবরাহ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি কচ্ছপখালী খালও পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। এতে কুয়াকাটায় বিনোদনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া লতাচাপলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের খাস পুকুরের চারদিকে ওয়াকওয়ে ও ঘাটলা নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা। পশ্চিম কুয়াকাটায় ডিবিএল ল্যান্ড-সংলগ্ন খাসজমিতে শিশুপার্ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি টাকা। দোভাষীপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত সড়কে এবং সমুদ্রবাড়ি রিসোর্ট থেকে নীলাঞ্জনা সড়ক পর্যন্ত ড্রেনের ওপর প্রশস্ত ফুটপাত নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ ১০ হাজার টাকা।
নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় উদ্যোগ
পর্যটননগরী কুয়াকাটার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ সমস্যা মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ চলছে।
নিরাপদ পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আটটি পরীক্ষামূলক নলকূপ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা। চারটি উৎপাদক নলকূপ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৯৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৯২ টাকা এবং চারটি পাম্প হাউস নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৯৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৬ টাকা।
এ ছাড়া আট কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৭ হাজার ২০ টাকা। এক হাজার গৃহসংযোগ স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। পাশাপাশি একটি ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার, একটি ওভারহেড পানির ট্যাংক, দুই কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইন এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা স্থাপনের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের দাবি
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, “প্রায় ২০০ কোটি টাকার চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কুয়াকাটার অবকাঠামোতে পরিবর্তনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পর্যটননগরীর ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য শুধু সড়ক ও ড্রেনেজ নির্মাণই যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের বিনোদন, হাঁটার পরিবেশ, রাতের নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।”
কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরামের অন্যতম সদস্য ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কুয়াকাটায় একটি দৃষ্টিনন্দন ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা যেতে পারে। পৌরসভা বাসস্ট্যান্ড থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ওয়াকওয়ে, বৃক্ষরোপণ এবং দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতি স্থাপন করা প্রয়োজন। এতে পর্যটকদের হাঁটার জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি হবে।
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পরিবেশকর্মী কেএম বাচ্চু বলেন, জিরো পয়েন্ট চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বনাঞ্চলসংলগ্ন সৈকত পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতির মাধ্যমে আলোকিত করা যেতে পারে। এ জন্য অন্তত এক মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পৌরসভার সব সড়কে সৌরবাতি স্থাপন করা হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি রাতের কুয়াকাটার সৌন্দর্যও বাড়বে।
আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ার প্রত্যাশা
স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, “কুয়াকাটাকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীত করার জন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কুয়াকাটা পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করার কাজ চলছে। একটি আধুনিক মানের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, নাগরিকসেবা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চলমান প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি ওয়াচ টাওয়ার, ওয়াকওয়ে, সৌরবিদ্যুৎচালিত সড়কবাতি ও বিনোদনকেন্দ্রের মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে কুয়াকাটাকে আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও পর্যটকবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হবে।








