একদিকে সাগরের তীব্র ভাঙনে গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বনাঞ্চলের আশপাশে থাকা ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছপালাসমৃদ্ধ এলাকা দখলের উদ্দেশ্যে টাঙানো হয়েছে আবাসন কোম্পানির সাইনবোর্ড। বনাঞ্চল, পানিপ্রবাহযুক্ত সরকারি খাল, জলাশয়, বিল ও খাসজমি দখল করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বনাঞ্চলের ভেতরে জোয়ার-ভাটার পানিপ্রবাহ বন্ধ করে শাখা খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরছে প্রভাবশালী মহল।
ফলে সহস্রাধিক একরজুড়ে বিস্তৃত পরিবেশ-সংবেদনশীল গঙ্গামতির সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলটি বহুমুখী সংকটে পড়েছে। বনাঞ্চলটি উজাড় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও তাদের নীরবতার পাশাপাশি কারও কারও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। উপকূলীয় সাগরপারের এই বৃহৎ বনাঞ্চলটি এখন ধ্বংসের মুখে। যেন চারদিক থেকেই চলছে দখলদারত্ব। সবকিছু চলছে ফ্রি-স্টাইলে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এসব দেখার কেউ নেই। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় গঙ্গামতির এই বনাঞ্চলটি বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। তবে এটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
২০০৪ সালের এক তথ্যে জানা গেছে, গঙ্গামতি ক্যাম্পের আয়তন ছিল ১ হাজার ১২৮ একর। এর অধিকাংশই ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চল, যা ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করে আসছে। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও সাগরের ভাঙনে বনাঞ্চলটির আয়তন ক্রমেই ছোট হয়ে এসেছে। বর্তমানে যা অবশিষ্ট রয়েছে, তা-ও ধ্বংসের মুখে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বনাঞ্চলটির দক্ষিণ দিকের একটি অংশ সাগরের অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। বন বিভাগের কার্যালয়ের পাশের উত্তর দিকের খাল-বিল, বনাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমিতে শোভা পাচ্ছে দুটি আবাসন কোম্পানির শত শত সাইনবোর্ড। একটি ‘সীভাইন ভিলেজ’, অন্যটি ‘বালিয়াড়ী’। সব মিলিয়ে বনাঞ্চলটিকে যেন গিলে খাওয়ার তাণ্ডব চলছে। আশপাশে বাঁধ দিয়ে বনের ভেতরের ছোট ছোট খাল দখল করা হচ্ছে। সেখানে মাছ ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে, পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাছগুলো মরতে শুরু করেছে।
জেলেরা জানান, আগে তাঁরা বনের ভেতর কিংবা আশপাশের ছোট ছোট চ্যানেল দিয়ে ট্রলার নিয়ে সাগরে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এখন সেসব চ্যানেলও দখল করা হয়েছে। বনের ভেতরের খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ আটকে প্রথমে ছইলা ও কেওড়া গাছ মেরে ফেলা হয়। পরে সেসব এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হয়। কোথাও চাষাবাদ করা হচ্ছে, আবার কোথাও টাঙানো হচ্ছে আবাসন কোম্পানির সাইনবোর্ড। এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকলেও বনাঞ্চল রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
গঙ্গামতি যাওয়ার পথে ধোলাই মার্কেটের আশপাশে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। সেখানকার সেতুর দক্ষিণ পাশে গঙ্গামতি সৈকতে যাওয়ার সড়কের ডানদিকে অসংখ্য ছইলা ও কেওড়া গাছের চারপাশে রিংবাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ আটকে দেওয়া হয়েছে। এতে অসংখ্য প্রাচীন ম্যানগ্রোভ গাছ বিবর্ণ হয়ে গেছে। স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গাছগুলো মরে গেলে একসময় ওই জায়গা দখল করা হবে।
আবসার আলী নামের এক জেলে জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেড়িবাঁধের মাটি কাটার জন্য এক্সকাভেটর (বেকু) মেশিন দিয়ে বাইরের মাটি কাটার সময় গাছপালাও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এতে দখলদারদের জন্য জায়গা দখল করা আরও সহজ হয়েছে। তিনি শত শত গাছের গোড়া দেখিয়ে বলেন, সেগুলো এখনো সেখানে পড়ে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে বনাঞ্চলের ভেতরে সোতা খালে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। পানির চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে প্রাচীন ছইলা ও কেওড়া গাছ মরে যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় ছাত্রসংগঠনের এক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে আরও দুই ব্যক্তি জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ভয়ে কেউ তাঁদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চান না। এভাবেই বন উজাড় করা হচ্ছে। কেউ কেউ সুযোগ বুঝে গাছ কেটে নিচ্ছেন। একপর্যায়ে এসব এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে।
বনাঞ্চলটির চারপাশের জমিতে চাষাবাদ করা হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে নতুন গাছের চারা জন্মানোর সুযোগও কমে যাচ্ছে। বনাঞ্চলটির ওপর যেন বহুমুখী নিধনযজ্ঞ চলছে। এভাবে কলাপাড়ার অন্যতম বৃহৎ সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলটি উজাড় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও বন বিভাগের কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়ছে না। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা কিংবা বনাঞ্চলটি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গঙ্গামতি বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, তিনি আজ-কালের মধ্যে বিষয়গুলো সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।









