সুন্দরবনে তিনটি বনদস্যু বাহিনীর হাতে অপহৃত ২১ জেলের ১২ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো তাদের উদ্ধার করতে পারেনি বন রক্ষায় নিয়োজিত কোনো বাহিনী বা প্রশাসন। মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত এসব জেলে কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন, তাও নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় একের পর এক অভিযান চালানোর পাশাপাশি সুন্দরবনের আকাশে আধুনিক ড্রোন উড়িয়েও অপহৃত জেলে ও বনদস্যুদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এতে উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন অপহৃত জেলেদের পরিবারের সদস্য ও মহাজনরা। ঘটনার পর থেকে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকার সাধারণ জেলেরা।
এদিকে শনিবার (৩ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্য এলাকার কটকা খালের সাগর মোহনায় নোঙর করে থাকা পর্যটকবাহী জাহাজ ‘দি ওয়েভ-২’-এ বনদস্যুরা ডাকাতির চেষ্টা করলে বনরক্ষীরা চার রাউন্ড গুলি ছুড়ে তা প্রতিহত করেন। সুন্দরবন বিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন জানায়, মুক্তিপণের দাবিতে তিনটি বনদস্যু বাহিনীর হাতে অপহৃত ২১ জেলেকে উদ্ধারে একের পর এক অভিযান চলছে। সুন্দরবনের আকাশে আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে অপহৃত জেলে ও বনদস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পাশাপাশি নৌপথেও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে কোস্টগার্ডের একাধিক দল। পাশাপাশি মৎস্য আহরণে নিয়োজিত জেলেদের নিরাপত্তায় টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নৌপুলিশ ও সুন্দরবন বিভাগ।
গত ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের নারকেলবাড়িয়া, আমড়িয়া, ভদ্রা ও ভাঙ্গা এলাকা থেকে বনদস্যু মজনু, করিম শরীফ ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রের মুখে মাছ ধরার সময় ২১ জেলেকে অপহরণ করে গভীর অরণ্যে নিয়ে যায়। এ সময় জেলেদের একটি ট্রলার, পাঁচটি মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামালও লুটে নেয় বনদস্যুরা।
মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত এসব জেলেদের পরিবারের কোনো সদস্য বা তাদের মহাজনরা বনদস্যুদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কোনোভাবে বিষয়টি প্রকাশ পেলে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরা এবং তাদের জীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকি আসতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা গণমাধ্যমে কথা বলতে নারাজ।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপহৃত জেলেদের একাধিক মহাজন জানান, তারা অপহৃত জেলেদের মুক্ত করতে বনদস্যুদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে গোপনে যোগাযোগ করছেন। মুক্তিপণ হিসেবে বনদস্যুরা কী পরিমাণ টাকা দাবি করেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে তা জানাতে রাজি হননি তারা। বর্তমানে বনদস্যুদের সঙ্গে মুক্তিপণ নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। কাঙ্ক্ষিত মুক্তিপণ পেলে অপহৃত জেলেদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বনদস্যুরা। দ্রুত মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের জন্য মহাজনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও জানান তারা।
এ অবস্থায় দুই দিনে ২১ জেলেকে অপহরণের পর থেকে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকার সাধারণ জেলেদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। বনদস্যু আতঙ্কে অনেকেই সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এসব জেলে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করে নিরাপদে মাছ ধরার নিশ্চয়তা চান।
বাগেরহাটে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, ১২ দিনেও অপহৃত ২১ জেলেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কোস্টগার্ডসহ নৌপুলিশের উদ্ধার অভিযান চলছে। সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলেদের রাতে দলবদ্ধভাবে সংশ্লিষ্ট বন অফিসের সামনে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের সব স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বনরক্ষীদের জেলেদের নিরাপত্তায় টহল বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে শনিবার রাতে কটকায় পর্যটকবাহী জাহাজে বনদস্যুদের ডাকাতির চেষ্টার আতঙ্কজনক খবর এসেছে। এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। সম্প্রতি সুন্দরবনে বনদস্যুদের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বনদস্যুরা জেলেদের ধরে নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। বনদস্যু দমনে সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের রাত্রীকালীন টহল চালু করা দরকার বলেও জানান ডিএফও।
মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহাবুব হোসেন জানান, সরকারের নির্দেশনায় সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে কোস্টগার্ড। এরই আলোকে অপহৃত ২১ জেলেকে উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে। বনদস্যুদের অবস্থান শনাক্তে আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পাশাপাশি নৌপথেও চিরুনি অভিযান চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব জেলেকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
সুন্দরবনের সব বনদস্যু বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তার পাশাপাশি পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা হবে। অন্যথায় বনদস্যুদের কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও জানান এই কোস্টগার্ড কর্মকর্তা।









