সবুজ শ্যামলিমার হাত ছানি দিয়ে ডাকা বিধাতার ণৈস্বর্গীক অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বিশ্বের বৃহত্তম জলাভূমি সুন্দরবনের করমজলে ঘুরে দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের উপছে পড়া ঢল। জলে কুমির ও ডাঙ্গায় বাঘ- কিং-কোবরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপের ভয়কে জয় করে লবণাক্ত জলাভূমির এই ম্যাগ্রোভ বন দেখতে এখন প্রতি বছরই বাড়ছে দেশি-বিদেশি পর্যটকে সংখ্যা। অক্সিজেনের এই অফুরান্ত সুন্দবন দিনরাত ২৪ ঘন্টায় ৬ বার তার রূপ বদলানোর পাশাপাশি শরণখোলা রেঞ্জের কটকার জামতলা সি-বীচে বসে সূর্য্যােদয়-সূর্য্যাস্ত দেখার মন মুগ্ধকর মূহুর্ত। সুন্দরী গেওয়া গরান পশুরসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছে আচ্ছাদিত এই চীর সবুজে ঘেরা বনের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বাঘ হরিণ কুমির ৬ প্রজাতির ডলফিনের চলাচলসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখার জন্য পর্যটকদের নিরান্তর আর্কষন করে সুন্দরবনকে।
সে জন্যই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ছুটে আসেন সুন্দরনের প্রাণ-প্রকৃতি উপভোগ করতে। বন বিভাগ বলছে, বঙ্গোরসাগর উপকূলে থাকা সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়াসহ নানা কারনে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) প্রতিকূলতা জয় করে গত বছর সুন্দরবনে পর্যটনে এসেছিল আড়াই লাখ পর্যটক। এরমধ্যে শুধু মাত্র বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রেই সুন্দরবন ঘুরকে আসা মোট পর্যটকের প্রায় ৮০ শতাংশ। সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম দুইটি বিভাগের ৪টি রেঞ্জের অন্যসব ইকোট্যুরিজম পর্যটন কেন্দ্র হারবাড়িয়া, আন্ধারমানিক, আলীবান্ধা, কলাগাছিয়া, কালবগিও শেখেরটেক ছাড়াও কটকা-কচিখালী, টাইগার পয়েন্ট, জামতলা সি-বীচ, সুপতি, ত্রিকোন আইল্যান্ড, শরণখোলা, বগি, বঙ্গোবন্ধু আইল্যান্ড, ডিমের চর, পক্ষির চর, দুবলারচর, চাঁদপাই, হিরণ পয়েন্ট, দোকেী, মান্দরবাড়িয়া, নীলকমলের মধ্যে আরো অনেক আকর্ষনীয় পর্যটন এলাকা থাকার পরও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সব থেকে বেশি টানে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র।
অনন্য করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র :
সমুদ্রের জেয়ারে চব্বিশ ঘন্টায় দুইবার প্লাবিত হওয়া সুন্দরবন তীব্র লবণাক্ত, মধ্যম লবণাক্ত ও মিষ্টি পানির অঞ্চলে বিভক্ত। পশ্চিশ সুন্দরবন বিভাগের সাতক্ষীরা ও খলনা রেঞ্জ এলাকা তীব্র লবণাক্ত, মধ্যম লবণাক্ত হওয়ায় সবুজের অধিক্য অনেক কম। সে কারনে সাতক্ষীরা ও খলনা রেঞ্জ এলাকার বন দেখতে পর্যটক আগমনের সংখ্যা অনেক কম। অন্যদিকে মিষ্টি পানির অঞ্চল বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা গাড় সবুজে আচ্ছাদিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা বন। ২০০০ সালে গড়ে তোলা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র লোকালয় থেকে মাত্র ২০ মিনিটের নৌদূরত্বে। সুন্দরবনের সব থেকে কাছের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম পর্যটন কেন্দ্রটি রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র তিন ঘন্টা দূরত্বে হওয়ায় দিনে এসে সুন্দরবন দেখে দিনের মধ্যে ফিরে যাবার সুযোগ থাকায় প্রতিদিনই শতশত দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ছুটে আসেন এখানে। পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে এক টানা নয় মাস সুন্দরবনের পর্যটন মৌসুম। বাগেরহাটের মোংলা পৌরসভার অপর পাড় অর্তাৎ পশুর নদী পার হয়েই করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম পর্যটন কেন্দ্রটি সারা বছরই পর্যটকদের জন্য উল্মুক্ত থাকে। এসব কারনে গত বছর সুন্দরবন দেখতে আসা আড়াই লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ৮০ ভাগই এসেছে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম পর্যটন কেন্দ্রটিতে। এই ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রটিতে রয়েছে ২৮টি চিত্র ও মায়াবি হরিণ, দুটি পুকর ও দুটি সেডে রয়েছে ৪টি মিঠাপানির প্রজাতিসহ লবণ পানি প্রজাতির আরো ৭১টি ছোট বড় কুমির। দুটি পুকুরে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ৪৯৭টি বাটগুল বাচকা কচ্ছপ। পাশাপাশি সুন্দরবনের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে কংক্লিটের উচু টাওয়ার, দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উচু ফুট ট্রেইল, ঝুলন্ত ব্রীজ, সুন্দরবনে প্রাণ—প্রকৃতি ব্যাখ্যা কেন্দ্র। এই প্রাণ—প্রকৃতি ব্যাখ্যা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে বাঘ, হরিণ, কুমির, তিমির হাড়সহ অঙ্গপ্রতঙ্গ চামড়া ও বাঘের একটি কংক্লাল। পুকুরে থাকা কুমিরকে ডাকলেই ওয়ালে কাছে চলে আসে। নিজ হাতে হরিণকে খাবার খাওয়ানো যায়। খাবার খেতে কাছে চলে আসে বানোরও। উচু ফুট ট্রেইল নিজ দিয়ে চলাচল করে কিংকোরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও বন্যপ্রাণী। সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপাল, শৈবাল, অর্কিড দেখার পাশাপাশি এই কেন্দ্রের বন্যপ্রাণী দেখে পর্যটকদের কষ্ট করে করমজল ইকোট্যুরিজম পর্যটন কেন্দ্রটিতে আসার ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে এক টানা নয় মাস সুন্দরবনের পর্যটন মৌসুম। এই পর্যটন মৌসুমে খুলনা থেকে ট্যুর অপারেটররা অর্ধশতাধিক বিলাস বহুল অত্যাধুনিক জাহাজ ও লঞ্চের মাধ্যমে সুন্দরবনে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সুন্দরবন ভ্রমনে নিয়ে আসে। বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে লঞ্চে করে সুন্দরবরে আসে পর্যটকরা। সুন্দরবনে সব সময় লোকের ভীড় থাকলে ম্যানগ্রোভ এই বনের প্রাণ-প্রকৃতির উপর চাপ সৃষ্টি হয়। এখানে ইকোসিস্টেম যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য বন বিভাগ সুন্দরবনে ইকোট্যুরিজমের ওপর সব সময়ে জোর দিয়ে থাকে। ]বনের উপর চাপ কমাতে বন বিভাগ ইতিমধ্যে সুন্দরবন ৭টি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। জুন থেকে আগষ্ট পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকসহ সব ধরনের বনজীবীদের সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকে। সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের উপর কোন চাপ পড়েনা এমন একটি মাত্রই ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র হচ্ছে করমজল। একারনে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রটি সারা বছরই দেশি-বিদেশি ইকোট্যুরিষ্টদের জন্য খোলা রাখা হয়। পর্যটন মৌসুমের ৯ মাসে সুন্দরবনে পর্যটকদের ঢল নামে। বর্তমানে পর্যটন মৌসুসে ইতমধ্যেইা সুন্দরবনে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। গত পর্যটন মৌসুমে সুন্দরবন ভ্রমন করেছে আড়াই লাখের উপর দেশি-বিদেশী পর্যটক। এর ৮০ শতাংশই করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রটিতে এসেছে। সরকারি লম্বা ছুটি ছাড়াও শুক্র ও শনিবার করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে পর্যটকের ঢল সামাল দিতে বন কর্মকর্তা-কর্মচারিদের হিমশিম খেতে হয়। আমরা সব সময় পর্যটকদের সবোর্চ্চ নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। চলতি পর্যটন মৌসুমে এক বা একাধিক কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে না পড়তে হলে এবার সুন্দরবনে রেকর্ড সংখক প্রায় তিন লাখ পর্যটকের আগমন ঘটবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই বন কর্মকর্তা। ##









