ডিজিটাল যুগ এবং ইন্টারনেট ক্রান্তির বহু আগে সংবাদ পরিবেশনের দ্রুততম মাধ্যম হিসেবে বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করেছিল একটি প্রযুক্তি—ফ্যাক্স (FAX)। আজ যা কেবল স্মৃতি কিংবা ইতিহাসের পাতা, নব্বইয়ের দশক কিংবা তারও আগে সেই ফ্যাক্স নির্ভর সংবাদপত্র প্রকাশনা ছিল সাংবাদিকতা ও তথ্য আদান-প্রদানের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
গতি আর আধুনিকতার প্রতীক
ফ্যাক্স সংবাদ একসময় সংবাদপত্র অফিসে সংবাদের প্রাথমিক উৎস ছিল ডাকসেবা কিংবা টেলিগ্রাফ। এতে বার্তা পৌঁছাতে কয়েক দিন বা সপ্তাহের বেশি সময় লেগে যেত। এরপর আসে টেলিগ্রাফিক সার্কিট ও টেলেক্স মেশিন। তবে আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশকে ‘ফ্যাক্স মেশিন’ এসে পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয়। টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে ছবি ও টেক্সট মুহূর্তের মধ্যে কাগজ আকারে চলে আসাটা তখনকার সময়ে সংবাদপত্র প্রকাশনার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বিশেষ করে রাত ১২টা বা ১টার সময় কোনো জরুরি আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক খবর পাঠাতে ফ্যাক্সই ছিল একমাত্র ভরসা। দূরে থাকা প্রতিবেদক বা জেলা প্রতিনিধিরা টাইপ করা বা হাতে লেখা কাগজ সরাসরি ফ্যাক্স করে দিতেন প্রধান কার্যালয়ে।
যেভাবে চলত তখনকার প্রকাশনা কাজ
সংবাদ পাঠানো: জেলা কিংবা বিদেশি প্রতিনিধিরা সংবাদ লিখে তা স্থানীয় কোনো ফ্যাক্স সুবিধা সম্বলিত দোকান বা অফিস থেকে পত্রিকাদপ্তরে পাঠাতেন।
সংবাদ গ্রহণ ও থার্মাল পেপার: ফ্যাক্স মেশিনের বিকট শব্দে রোল করা থার্মাল পেপারে একে একে বের হতো টেক্সট বা খবরের পেজ। সময়ের সাথে সাথে এই থার্মাল পেপারের লেখা অস্পষ্ট বা ঝাপসা হয়ে যেত, তাই দ্রুত তা হাতে নিয়ে কম্পোজের ব্যবস্থা করা হতো।
হাতে কলমে এডিটিং: ফ্যাক্সে আসা নিউজ কাটছাঁট করতে নিউজরুমের সাব-এডিটর বা বার্তা সম্পাদকরা লাল কলম দিয়ে কাগজের ওপর কাটাকাটি করতেন।
ছবি পাঠানো: কোনো দূরবর্তী স্থান থেকে ছবি আনা ছিল চরম চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ প্রযুক্তির ‘ফ্যাক্স ফটো ট্রান্সমিটার’ দিয়ে ছবিকে সিগন্যালে রূপান্তর করে পাঠানো হতো, যা গ্রহণ করতে সময় লাগত বেশ কিছু মিনিট।
পুরোনো দিনের ফ্যাক্স নির্ভর সাংবাদিকতায় যেমন ছিল উত্তেজনাকর গতি, তেমনি ছিল নানা ভোগান্তি। অনেক সময় লাইন কেটে যেত, পৃষ্ঠা অর্ধেক এসে আটকে থাকত কিংবা লেখা এতোটাই ঝাপসা হতো যে পড়া অসম্ভব হয়ে উঠতো। ডেডলাইনের মুখে ফ্যাক্স মেশিন পেপার জ্যাম হলে বা টেলিফোন লাইন ডিস্টার্ব করলে পুরো নিউজরুমজুড়ে নেমে আসত তুমুল হট্টগোল।
সংবাদপত্রের পাতায় কোনো এক্সক্লুসিভ খবর ছাপা হওয়ার পেছনে একসময় প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করত ছোট্ট এই প্রযুক্তিটি।
আজকের ডিজিটাল যুগ
আজকের ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট, ইমেইল, মেসেজিং অ্যাপ আর রিয়েল-টাইম ডিজিটাল নিউজ পোর্টালের যুগে সেই ফ্যাক্স নির্ভর সাংবাদিকতা কেবলই এক সোনালী অতীত। কাগজ রোল হওয়া সেই পরিচিত শব্দ কিংবা ফ্যাক্স মেশিনের বিপিং ডায়াল টোন এখন আর নিউজরুমে শোনা যায় না। কিন্তু সংবাদপত্রের বিবর্তনের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে খবর প্রকাশের যে বীজ প্রোথিত হয়েছিল, তা ছিল এই ফ্যাক্স প্রযুক্তিরই অবদান।









