সিআইপিজি আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হতে না পারলে দেশে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বৈঠকে বক্তারা বিচারব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। তারা উল্লেখ করেন, মাত্র দুটি আপিল বেঞ্চ থাকায় বর্তমানে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে প্রায় ৪৭ লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলছে।
ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবিএম গোলাম মুস্তফা বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু রাত নয়, দিনের আলোতেও মানুষ নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছে না। মেজর সিনহা ও রামিসা হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সুশাসনের অভাবেই দেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা ‘মব জাস্টিস’ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রায় ১ কোটি বেকারের মধ্যে ৪১ থেকে ৪৫ লাখই শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। কেউ অপরাধী হয়ে জন্মায় না; সমাজ ও রাষ্ট্রই তাকে অপরাধী বানিয়ে তোলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে অপরাধে লিপ্ত হতে বাধ্য করছে।
ফেলানি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা শিথিল থাকা ও মাদকাসক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরাধ চরম রূপ নিচ্ছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে সরকার ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষ একবেলা না খেয়ে থাকলেও একটি নিরাপদ জীবন প্রত্যাশা করে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল কাইয়ুম ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশের বিভিন্ন শাসনামলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। তিনি বলেন, ১৯৭২-৭৫ সালে দেশের আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৭৯-৮০ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে পোশাকশিল্প ও বিদেশে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতা লাভ করে।
পরবর্তীতে এরশাদ আমল, তিন জোটের রূপরেখা এবং গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনসেবার চেয়ে কেবল সরকারের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সাবেক সচিব মো. হুমায়ুন কবীর সংক্ষেপে বলেন, কোনো কাঠামোগত আইন পরিবর্তন করার আগে রাষ্ট্র ও সমাজে সর্বাগ্রে ‘সৎ ও নৈতিক মানুষ’ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় কোনো আইনই কার্যকর সুফল দেবে না।
পরিশেষে, সিআইপিজির নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম উপস্থিত সব অতিথি, আলোচক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।









