শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঘড়িসার ইউনিয়নে হুগলী নদীর ওপর প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ৯০ মিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন কংক্রিটের সেতু। তিন বছর আগে সেতুটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনো নির্মাণ হয়নি মাত্র ১০৫ মিটার সংযোগ সড়ক। ফলে সেতুতে ওঠানামার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের ভরসা করতে হচ্ছে বাঁশের তৈরি প্রায় ২৫ ফুট উঁচু চঙ্গ বা সিঁড়ির ওপর।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর পশ্চিম প্রান্তে ওঠার জন্য কোনো সংযোগ সড়ক নেই। সেখানে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি চঙ্গের মতো সাঁকো ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে সেতুতে উঠছেন স্থানীয়রা। সামান্য অসাবধানতাতেই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এ পথ আরও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষাকালে চঙ্গ পিচ্ছিল হয়ে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, নড়িয়া উপজেলার সঙ্গে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার একাংশের সহজ সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য হুগলী নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নদীটি দীর্ঘদিন ধরে দুই এলাকার মানুষের যোগাযোগে বড় বাধা হয়ে ছিল। শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের জন্য সখিপুরের অন্তত ছয়টি ইউনিয়নের মানুষ নড়িয়ার ওপর নির্ভরশীল।
এর আগে নদী পারাপারে নৌকা ও ট্রলার ব্যবহার করতে হতো স্থানীয়দের। নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে দুই উপজেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার।
এলজিইডি দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কসহ সেতুটি নির্মাণে ১১ কোটি ২৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯২৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নিয়াজ আর কে জে ভি ২০২১-২২ অর্থবছরে নির্মাণকাজ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি ৯০ মিটার দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতু এবং সখিপুর অংশে সেতুর পূর্ব পাশে ১৮৩ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ শেষ করে।
তবে জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণে নড়িয়া অংশের ১০৫ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সেতুটি নির্মাণ শেষ হলেও এর সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না দুই পাড়ের মানুষ।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মিথিলা বলেন, বৃষ্টি হলে চঙ্গ পিচ্ছিল হয়ে যায়। কয়েকবার পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছেন তিনি। এ কারণে স্কুলে যেতেও দেরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, ‘সাড়ে ১২ কোটি টাকার ব্রিজ হয়েছে, কিন্তু আমাদের দুর্ভোগ কমেনি। এই চঙ্গ দিয়ে অসুস্থ মানুষ নিয়ে ওঠানামা করা খুবই কষ্টের।’
কৃষক আজগর হাওলাদার বলেন, সংযোগ সড়ক না থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয়। এতে সময় ও পরিবহন খরচ—দুটিই বাড়ছে।
এদিকে জমির মালিকেরা জানিয়েছেন, তারা উন্নয়নের বিপক্ষে নন। ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হলে জমি দিতে তারা প্রস্তুত। জমির মালিক শাহ আলম মাল বলেন, ‘আমরা জমি দিতে রাজি। তবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দোকান সরিয়ে দিলে আমাদের আয় বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বিষয়টির একটি সমাধান হওয়া দরকার।’
নড়িয়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, জমি নিয়ে জটিলতার কারণেই সংযোগ সড়কের কাজ আটকে আছে। জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি দিতে রাজি না হওয়ায় সেখানে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম বলেন, প্রকল্প গ্রহণের সময় স্থানীয়রা জমি দেওয়ার বিষয়ে মৌখিকভাবে সম্মতি দিলেও পরে জমির মালিকেরা অবস্থান পরিবর্তন করেন। প্রকল্পের বরাদ্দে জমি কেনার অর্থ না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে বিকল্প কোনো উপায়ে দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের চেষ্টা চলছে।
প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে দুই উপজেলার মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাই দ্রুত সংযোগ সড়কের জটিলতা নিরসন করে সেতুটিকে পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।









