পায়রা সমুদ্রবন্দর, কুয়াকাটা-রাঙ্গাবালী পর্যটনকেন্দ্র, মহিপুর মৎস্যবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সামুদ্রিক সম্পদ ঘিরে পটুয়াখালী-৪ আসনকে দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও সম্ভাবনাকে জাতীয় নীতিনির্ধারণে আরও গুরুত্ব দিতে আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর কলাপাড়া প্রেসক্লাবে কলাপাড়া নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, পটুয়াখালী-৪ আসনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উপকূলীয় এই জনপদকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের করিডোরে পরিণত করতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনপ্রতিনিধির প্রয়োজন রয়েছে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-৪ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন এবিএম মোশাররফ হোসেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য। নির্বাচনের পাঁচ দিন পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তবে একই দিন গঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় তাঁকে রাখা হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত তালিকাতেও তাঁর নাম নেই। এতে আশাহত হয়েছেন উপকূলীয় বাসিন্দারা।
পটুয়াখালী-৪ আসনের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জাতীয় পর্যায়ে এর গুরুত্ব রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এই এলাকায় রয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দর, শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, মৎস্য অবতরণকেন্দ্র এবং কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র। পায়রা বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতের বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বন্দরের সঙ্গে সড়ক ও নৌযোগাযোগ, শিল্প ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো, আবাসন, পানি, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, এই অঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে শুধু একটি সংসদীয় আসনের উন্নয়ন হিসেবে না দেখে দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, মন্ত্রিসভায় এলাকার একজন প্রতিনিধি থাকলে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে এসব বিষয় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
দেশের অন্যতম পরিচিত সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় রয়েছে সমুদ্রসৈকত, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ, রাখাইন সংস্কৃতি, শুঁটকি শিল্প এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রার বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্ভাবনা। স্থানীয়দের মতে, কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে শুধু সৈকত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগও প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
পটুয়াখালী-৪ আসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত মৎস্য। মহিপুর ও আলীপুরসহ আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় মাছ আহরণ, অবতরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিপণনের সঙ্গে হাজারো মানুষ যুক্ত। জেলেদের জন্য নিরাপদে মাছ ধরার সুযোগ, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি দীর্ঘদিনের বলে জানান স্থানীয়রা। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, সাগরে মাছের প্রাপ্যতা, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জীবিকা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, মৎস্যসম্পদকে শুধু উপকূলের মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। আধুনিক মৎস্য অবতরণ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে সামুদ্রিক মাছের মূল্য সংযোজন ও রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীর বড় একটি জনগোষ্ঠী কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তবে উপকূলীয় লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, লবণাক্ততা-সহনশীল জাত, জলবায়ু-সহনশীল কৃষিপদ্ধতি, আধুনিক সেচব্যবস্থা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় বাড়তে পারে। কৃষির সঙ্গে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও পর্যটনকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উপকূলীয় জনপদ হিসেবে পটুয়াখালী-৪-এর মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় এখানকার মানুষকে। স্থানীয়দের দাবি, উপকূলের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং টেকসই বেড়িবাঁধ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পটুয়াখালী-৪-এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উপকূলীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তাঁরা।
রাঙ্গাবালী উপজেলা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রাকিবুল হাসান মুরাদ বলেন, চলতি বছরের নির্বাচনে পটুয়াখালী-৪ আসনে এবিএম মোশাররফ হোসেনের বিজয়ের পরপরই তাঁকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি সামনে আসে। কিন্তু সরকার গঠনের সময় তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা হতাশ হয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় তাঁকে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি হলে পটুয়াখালী-৪-এর পায়রা বন্দর, কুয়াকাটা ও চর হেয়ার পর্যটনকেন্দ্র, মহিপুর মৎস্যবন্দর, কৃষি, সামুদ্রিক সম্পদ এবং উপকূলীয় জনপদের দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়গুলো জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পাবে।
পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মজিবুর রহমান টোটন বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে সংসদীয় পটুয়াখালী-৪ আসনটি অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। দেশের তৃতীয় পায়রা সমুদ্রবন্দর, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, মৎস্যবন্দর ও দৃষ্টিনন্দন কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত এই আসনেই অবস্থিত জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে এই আসনে একজন মন্ত্রী থাকা গুরুত্বপূর্ণ।









