মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: বাদুরতলীর খালটি প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ। আর প্রস্থ অবস্থানভেদে ২০০ থেকে ৩৫০ ফুট। অথচ এই স্লুইস সংযুক্ত খালটিতে একাধিক স্থানে মাটির বাঁধ দিয়ে ১৫-২৫/৩০ ফুট প্রস্থ কালভার্ট করা হয়েছে। পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। ফলে ক্রমশ পলির আস্তরণে ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া দুইপাড়ে খাল দখল করে অসংখ্য স্থাপনা করা হয়েছে। বাড়িঘর থেকে পুকুর পর্যন্ত করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে এভাবে খালের স্বাভাবিক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করে দেওয়ায় খালটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এই খালের পানি টিয়াখালী ইউনিয়নের একাংশসহ পৌরসভার শত শত মানুষ কৃষিকাজসহ নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার করছেন। একই অবস্থা চিংগুরিয়া খালটির অবস্থা। প্রায় ৭০-৮০ ফুট প্রস্থ খালটিতে মূল সড়ক করতে মাত্র ৫-৭ ফুট প্রস্থ একটি কালভার্ট করা হয়েছে। চাকামইয়া নিশানবাড়িয়া থেকে দিত্তার দিকে বহমান প্রায় এক শ ফুট প্রস্থ খালে মাত্র ২০ ফুট প্রস্থ একটি কালভার্ট করা হয়েছে। এভাবে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় শত শত খালের পানির প্রবাহ আটকে অপরিকল্পিতভাবে যোগাযোগের সড়ক নির্মাণের নামে অপ্রশস্থ কালভার্ট করা হয়েছে।
আবার কোথাও কোথাও বাঁধ দিয়ে পানি চলাচলের পথ সম্পুর্ণভাবে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব স্লুইস সংযুক্ত ড্রেনেজ খালগুলোয় অপ্রশস্ত কালভার্ট করায় শত শত খালের পানির প্রবাহ আটকে ভরাট হয়ে গেছে। খালগুলো মরা খালে পরিণত হয়েছে। এসব খালকে আবার আশির দশকে স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে চাষযোগ্য কৃষি জমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এভাবে অপরিকল্পিত উন্নয়নের পাশাপাশি ভূমি অফিসের এক শ্রেণির কর্মচারী ও তাঁদের দালালদের যোগসাজশে খালগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আর এর ফলে গত দশ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার ধকলে পড়ছেন কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। আর শুকনো মৌসুমে থাকছেনা রবিশস্যসহ সবজি চাষের স্বাদু পানি। কৃষি ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এই সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
কৃষক সুলতান গাজী জানান, খালের পানি চলাচলের পথ বন্ধ করা সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত। দশটি কালভার্ট না করে খালের প্রস্থ সমান একটি গার্ডার ব্রিজ করলে এই স্থায়ী সমস্যা হতো না। খাল না থাকলে পানি থাকবে না। আর পানি না থাকলে কৃষি উৎপাদন থাকবে না। আর পরিবেশের বিপর্যয় তো হবেই।
পরিবেশ সংগঠক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ সরকারিভাবে খালের উপরে যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কোন ধরনের পরামর্শ করা হয় না। তাঁদের মতামত নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র ব্যবসায়ীক ধ্যান-ধারণায় খালে বাঁধ ও অপ্রশস্থ কালভার্ট করে এখন পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনা হয়েছে। এক পশলা বৃষ্টি হলেই গ্রাম শহর সর্বত্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এজন্য এখন থেকে খালের প্রস্থ ঠিক রেখে কালভার্ট কিংবা ব্রিজ করতে হবে।’ পাশাপাশি পানির প্রবাহ আটকে ছোট ছোট করা কালভার্ট ভেঙে পানির প্রবাহ সচল করার পরামর্শ তার।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কলাপাড়া প্রতিনিধি মুহাম্মদ আল ইমরান বলেন, ‘বিগত দিনগুলোতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল তারা সাধারণ মানুষের মতামত উপেক্ষা করে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো উন্নয়ন করতে গিয়ে পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস করেছে। আর এতে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে সরকারি দুনর্ীতিবাজ কর্মচারীরা । ফলে সবক্ষেত্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।’
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, গত ছয় মাসে খাল দখল করে দেওয়া অর্ধশতাধিক অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে। পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে এই অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় এখন খাল খনন কিংবা কোন প্রকল্প নেওয়া হলে কৃষকের পরামর্শ নিয়েই করা হচ্ছে।









