এস এম শাহাদাত: এক সময় আড়াইহাজার নাম বললেই চোখে ভাসত খাঁটি আখের গুড়ের কড়াই আর আগুনে জ্বলা চুলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা ছুটে আসতেন নারায়ণগঞ্জের এই জনপদে। কিন্তু আধুনিকতার চাপে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, উন্নত বীজের সংকট ও ভেজাল গুড়ের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছিল শত বছরের এই ঐতিহ্য। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে আড়াইহাজারের আখের গুড়।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বড় বিনাইরচর ও ছোট বিনাইরচর গ্রাম একসময় ছিল আখের গুড় উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। এখানকার খাঁটি গুড়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন জেলায়। সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে গেলেও হাল ছাড়েননি এখানকার কৃষকরা। পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে আবারও শুরু করেছেন আখ চাষ ও গুড় তৈরি।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আড়াইহাজার উপজেলায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন আখ। হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন প্রায় ৭০ মেট্রিক টন, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে।
আখ থেকে গুড় তৈরির প্রক্রিয়াও বেশ সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। প্রথমে আখ কেটে খুঁচির মাধ্যমে রস বের করা হয়। এরপর স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রস পরিষ্কার করতে বিশেষ পদ্ধতিতে ছাঁকানো হয়। গৌর হওয়ার আগমুহূর্তে খেলা জালি দিয়ে আবারও রস পরিষ্কার করা হয়। এরপর কোচ দিয়ে বারি দিয়ে দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা আগুনে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় খাঁটি গুড়। স্থানীয় জাত ৫২৭, ঈশ্বরদী-১৬, টেন আই, লোহাটাংসহ বিভিন্ন জাতের আখ ব্যবহার করে একেকটি কড়াইয়ে তৈরি হয় প্রায় ৫০ কেজি গুড়।
এই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মাসুদ খান। তিনি নিজ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উন্নত জাতের আখের বীজ সংগ্রহ করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করেন। এতে নতুন করে আখ চাষে আগ্রহী হয়েছেন অনেক কৃষক।
কৃষকদের আশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে আড়াইহাজার আবারও পরিচিত হবে খাঁটি আখের গুড়ের জন্য। তারা মনে করেন, শত বছরের এই ঐতিহ্য শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, দেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আখ চাষীরা বলছেন, সংগ্রাম থাকলেও তারা আশাবাদী। তাদের বিশ্বাস—সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আড়াইহাজারের আখের গুড় আবারও দেশের বাজারে নিজস্ব জায়গা করে নেবে।









