আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি: ভিক্ষুক পুনর্বাসনের আওতায় গরু পেয়ে দুই পা হারোনো প্রতিবন্ধী সিরাজ (৬২) কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, ‘মুই এ্যাহন এট্টু বাঁচতে পারমু’। এতদিন ভিক্ষা কইর্যা খাইতাম এ্যাহন আর ভিক্ষা করমু না। সিরাজের মত একই কথা বললেন গুলিশাখালী গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা ভিক্ষুক মীম আক্তার (৩২)। এভাবে গুরু পাওয়া প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক আমিনুল , দোকান পাওয়া ফজলুল করিম (৫৫) ও আরিফা বেগম। গরু ও দোকান পেয়ে সবার মুখেই যেন এখন আনন্দ অশ্রু।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩টায় উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে ভিক্ষুকদের হাতে যখন গরুর দড়ি তুলে দেন আমতলীর ইউএনও মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী তখন সব ভিক্ষুকরাই যেন তাদেও বাঁচার ভরসা পেয়েছেন বলে কেউ কেউ হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন।
আমতলী উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে ভিক্ষুকমুক্ত আমতলী উপজেলা গড়ার প্রত্যয়ে দুর্ঘটনায় আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের দুই পা হারানো ভিক্ষুক সিরাজ, গুলিশাখালী গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা অসুস্থ্য মীম, চাওড়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম, গোছখালী গ্রামের নাজমা বেগম এই চারজন ৩০হাজার টাকা করে ১লক্ষ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি গরু এবং এক নম্বর ওয়ার্ডের অরিফা বেগম ও কেওয়াবুনিয়া গ্রামের ফজলুল করিম দোকান পেয়ে আবেগ আপ্লুতের পর মহা খুশি।
আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের সহায় সম্বলহীন সিরাজ ২০২০ সালে এক দুর্ঘটনায় দুটি পা হারান। এরপর থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য হুইল চেয়ারে বসে আমতলী শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা বৃত্তি করে জীবন চালাতেন।
একই অবস্থা গুলিশাখালী গ্রামের মীম আক্তারের। বিয়ের পর পেটে সন্তান থাকা অবস্থায় স্বামী আনিস নিরুদ্দেশ হন। শারিরিক অসুস্থ্য মীম মানুষের বাসা বাড়িতে ঝি এর কাজ করাসহ ভিক্ষা করে মেয়ের এবং নিজের জীবন চালাতেন।
চাওড়া গ্রামের আমিনুল ইসলামও দুর্ঘটনায় একটি পা হারান। চিকিৎসা করাতে তিনি নি:স্ব হয়ে এক পর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ভিক্ষুকের পেশা বেছে নেন।
গোছখালী গ্রামের নাজমা বেগমের একই অবস্থা। অসুস্থ শরীরে সংসার চালানোর মত কেউ না থাকায় ভিক্ষা করে জীবন চালাতেন।
পৌরসভার ওয়াপদা সড়কের আরিফা ও কেওয়াবুনিয়া গ্রামের ফজলুল করিমও অসহায় হয়ে ভিক্ষা করে জীবন চালাতেন।
দোকান পেয়ে কেওয়াবুনিয়া গ্রামের ফজলুল করিম বলেন, বাবা বয়সের ভারে এ্যাহন আর ভিক্ষা হরতে পারি না। ভিক্ষা হরতে না পারলে হে দিন না খাইয়া থাহোন লাগে। এ্যাহন বাচার এট্টু ভরসা পাইছি।
আরিফা বেগম বলেন, ভিক্ষা ছাড়া মোর কোন উপায় আছিল না। স্যারেরা মোরে এ্যাহন বাছার পথ কইর্যা দেছে। আল্লায় যেন হেগো ভালো রাহে।
চাওড়া গ্রামের আমিনুল বলেন, মুই গরুডারে পাইয়া ব্যামালা খুশি। এই গরু পাইল্যা ব্যামালা গরু বানামু। হেইয়ার পর মুই দুধ বেইচ্যা খামু।
চলতি বছর আমতলী উপজেলা প্রশাসন ৬ জন ভিক্ষুকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন। এবং তাদের আবেদনের ভিত্তিতে এই ৬ জনকে বাছাই করে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্বাসনের জন্য ৪ জনকে প্রতিটি ৩০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি গরু ও ২ জনকে প্রত্যেকে ২৫ হাজার টাকা করে দুটি মুদি ও মনোহরি দোকান দিয়ে পুনর্বাসন করেন।
আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক কাওসার বলেন, অনেক আবেদনের মধ্যে থেকে সরেজমিন বাছাই করে ৬ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ভিক্ষুক মুক্ত আমতলী উপজেলা গড়ার প্রত্যয়ে এই পর্য়ায়ে ৬ জন ভিক্ষুকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বরাদ্দ পাওয়া গেলে এই বছর আরো কিছু ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করা হবে বলে আসা করছি।








