পটুয়াখালীর গলাচিপায় ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং চরাঞ্চলে তরমুজ চাষকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
রোববার (৮ নভেম্বর) গলাচিপা উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নুরুল হক নুর বলেন, ‘একটি কঠিন সময়ে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যারা গত প্রায় ৪০ বছর ধরে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। বিশেষ করে গত ১৭ বছরে আপনাদের অনেকে এলাকায় থাকতে পারেননি, বাড়িতে ঘুমাতে পারেননি, মিথ্যা মামলার আসামি হয়েছেন, এমনকি দলীয় কার্যালয়ও খুলতে পারেননি।’
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর গলাচিপা-দশমিনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তাঁদের তুলনায় কেউ হামলা-মামলা বা হয়রানির শিকার হননি। তাঁরা বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, দোকানদারি করছেন এবং স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করছেন।
নুর আরও বলেন, ‘আমরা চাইনি, অতীতে আমাদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে, আমরাও তাঁদের সঙ্গে একই আচরণ করি। আমি বলেছি, এলাকার মানুষ এলাকায় থাকুক। তবে যারা অতিরিক্ত অন্যায় করেছে, তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাদের নিজেদেরই করতে হবে। প্রকৃতিরও একটি বিচার রয়েছে, যাকে বলা হয় ন্যাচারাল পানিশমেন্ট।’
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাঁদের উদারতার সুযোগ নিয়ে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের শেখ হাসিনার সঙ্গে অনলাইনে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিভিন্ন জায়গায় কারা বক্তব্য দিয়েছেন, তাঁদের তালিকা ও অডিও প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা একজন দায়িত্বশীল নেতৃ এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। উদারতার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন পরিস্থিতির অপব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে নুরুল হক নুর বলেন, স্থানীয় নির্বাচন কিংবা অন্য কোনো কারণে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঢাকায় লোক পাঠানো বা বাস ভাড়া করার মতো কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, তাঁদের বিষয়ে নেতাকর্মীদের নজরদারি রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও খেয়াল রাখার আহ্বান জানান তিনি।
চরাঞ্চলে তরমুজ চাষ ও জমি ইজারা নিয়ে সম্ভাব্য বিরোধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গলাচিপা ও দশমিনার চরাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে তরমুজ উৎপাদিত হয়। বিগত বছরগুলোতে এসব চরে প্রায় এক মৌসুমের জন্য জমি ইজারা নিয়ে তরমুজ চাষ করা হতো। কিন্তু ভোলা, গলাচিপা ও দশমিনায় বিভিন্ন কারণে এবার এখন পর্যন্ত ইজারা দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, সরকারি দল, জোট এবং এলাকার জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব রয়েছে, চর নিয়ে যেন কোনো ধরনের মারামারি, হানাহানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। প্রয়োজনে এসব চরে তরমুজ চাষ বন্ধ রেখে লাল নিশান টাঙিয়ে দেওয়া হোক, তবু কোনোভাবেই সংঘাত হতে দেওয়া যাবে না।
চর দখল ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরির অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে নুর বলেন, বিগত দিনে যারা এসব চর দখল করে ভাগদখল করেছেন এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কারণে সব সময় এলাকায় আসা সম্ভব হয় না। জাতীয় পর্যায়েও বিভিন্ন কাজ করতে হয়। তাই এলাকায় থাকা নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা ও ফিসফাস না করে সবাই একসঙ্গে বসে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু-একটি নেতিবাচক বক্তব্য বা ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে তাতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তাঁদেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির যেসব নেতাকর্মী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুমের কোনো অভিযোগ তাঁরা পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে নুরুল হক নুর বলেন, এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে নির্বাচনের অর্জন অর্থবহ হবে না। তাই গণঅধিকার পরিষদের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে একসঙ্গে বসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানান তিনি। স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রশাসনের সহযোগিতা ও পরামর্শে সম্মিলিতভাবে সমাধানের পথ বের করার পরামর্শ দেন প্রতিমন্ত্রী।
গলাচিপা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ গোলাম মোস্তফার সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলতাব হোসেন খান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব মিয়া, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন খান, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইখতিয়ার রহমান কবির, পটুয়াখালী জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. শিপলু খানসহ উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা।









