পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নেই একসময় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী তালপিঠা ও তালের আঁটির শাঁস ছিল মানুষের প্রিয় খাবার। কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া, তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং কাঁচা তাল সংগ্রহের প্রবণতায় গ্রামীণ জনজীবন থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে তালের আঁটির শাঁসসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার।
‘তালের পিঠা খাইতে লাগে মিঠা’—গ্রামবাংলার মানুষের মুখে প্রচলিত এই প্রবাদ একসময় দশমিনার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। শীত আসার আগেই তালের রস থেকে তৈরি নানা ধরনের পিঠা, পায়েস ও অন্যান্য মুখরোচক খাবারের আয়োজন চলত গ্রামে গ্রামে। তালের আঁটির সাদা শাঁসও ছিল সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
একসময় উপজেলার প্রতিটি গ্রামেই তালপিঠা তৈরির উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যেত। স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি হতো তালের গুড় ও পাটালি। শীতকালে তালের গুড় দিয়ে তৈরি রুটিরও ছিল ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আগের মতো পাকা তাল পাওয়া যায় না। ফলে কমে গেছে তালের পিঠা তৈরির আয়োজনও।
গ্রামবাংলার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পাকা তাল থেকে আঁশমুক্ত রস বের করার পর বাড়ির বসতঘরের পাশে ছোট মাচা তৈরি করে সেখানে তালের আঁটি সংরক্ষণ করা হতো। শীত আসার আগে আঁটি থেকে ছোট অঙ্কুর বের হলেই তা কেটে ভেতর থেকে সাদা শাঁস বের করে খাওয়া হতো। নারিকেলের শাঁসের মতো দেখতে এই সাদা শাঁস ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু ও মজাদার।
উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এখনো কিছু তালগাছ দেখা গেলেও আগের তুলনায় তা অনেক কম। গরমের সময় কাঁচা তাল কেটে বিক্রি করায় পাকা তালও তুলনামূলক কম পাওয়া যায়। অথচ একসময় গ্রামের গৃহস্থবাড়ির পাশে পাকা তালগাছের ছিল বিশেষ কদর।
গৃহিণীরা পাকা তাল থেকে আঁশমুক্ত রস বের করে তাতে নারিকেল, চালের গুঁড়া ও চিনি কিংবা গুড় মিশিয়ে তৈরি করতেন ছোট-বড় বড়া, তালের তিলের খুবার, পাটিসাপটা, মালপোয়া ও তালের রুটি। এসব খাবার ঘিরে গ্রামীণ পরিবারগুলোতে তৈরি হতো আনন্দঘন পরিবেশ। কিন্তু এখন আর আগের মতো পাকা তাল পাওয়া যায় না। ফলে তালপিঠা তৈরির উৎসবও হারিয়ে যাচ্ছে।
দশমিনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক গণমাধ্যমকর্মী নেছার উদ্দিন আহমেদ বলেন, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে ছোট-বড় সবার কাছেই তালের আঁটির শাঁস ছিল বেশ জনপ্রিয় খাবার। গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারের বসতঘরের পাশে মাচায় তালের আঁটি রাখা হতো। শীত আসার আগে আঁটি থেকে অঙ্কুর বের হলেই তা কেটে সাদা শাঁস বের করে খাওয়ার মধ্যে ছিল অন্যরকম আনন্দ। বসতঘরের উঠানে সবাই একসঙ্গে গোল হয়ে বসে তালের আঁটির শাঁস খেতেন। সেই আনন্দঘন গ্রামীণ সংস্কৃতি এখন আর তেমন দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সংস্কৃতির চর্চা কমে গেছে। গ্রামের সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছের দৃশ্যও এখন আগের মতো চোখে পড়ে না।
সচেতন মহলের মতে, তালগাছ শুধু গ্রামীণ পরিবেশের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তালগাছ রোপণ ও সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া খাবার ও ঐতিহ্যও তুলে ধরা সম্ভব হবে।









