উত্তাল বঙ্গোপসাগর, বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের আতঙ্ক, বৈরী আবহাওয়া আর আগের মৌসুমের লোকসানের বোঝা—সব প্রতিকূলতা নিয়েই সুন্দরবনের দুবলার চরে শুরু হয়েছে পাঁচ মাসের শুঁটকি আহরণ মৌসুম। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোর থেকে শুরু হওয়া এ মৌসুম চলবে আগামী বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।
দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে সুন্দরবনের দুবলার চরকেন্দ্রিক শুঁটকিপল্লিগুলো থেকে। ফলে এই মৌসুম ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী। তাঁদের প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত মাছ আহরণ ও শুঁটকি বিক্রির মাধ্যমে আগের লোকসান কাটিয়ে ঋণের বোঝা কিছুটা হলেও কমাতে পারবেন।
সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের আওতাধীন আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালার চর—এই চারটি চরে প্রতিবছর শীত মৌসুমে গড়ে ওঠে বিশাল অস্থায়ী শুঁটকিপল্লি। প্রায় শত বছর ধরে এখানে সামুদ্রিক মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির ঐতিহ্য চলে আসছে।
কোরাল, লাক্ষ্যা, রূপচাঁদা, লইট্যা, ছুরি, চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বঙ্গোপসাগর থেকে ধরে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুঁটকি। পরে এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশেও বাজারজাত করা হয়।
এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বন বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়ে জেলে ও মহাজনেরা দুবলার চরে ছুটে এসেছেন। শুঁটকি উৎপাদনকে কেন্দ্র করে ৬৬টি অস্থায়ী ডিপোঘর, ১ হাজার ৮টি জেলেঘর এবং ১১৬টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্থায়ী দোকান গড়ে উঠছে। সব মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি জেলের কর্মসংস্থান হবে এই মৌসুমে। এর পাশাপাশি মাছ পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, নৌযান ও জাল মেরামত, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন আরও কয়েক হাজার মানুষ।
ঋণ নিয়ে আবারও সাগরে মহাজনেরা
গত মৌসুমে জলদস্যুদের চাঁদাবাজি, জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছিলেন জেলে ও মহাজনেরা। অনেক ব্যবসায়ী এখনো আগের ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। তারপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নতুন করে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার সাগরে নামছেন তাঁরা।
আলোরকোল শুঁটকিপল্লির রামপাল জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মহাজন বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা জাকির শেখ জানান, গত মৌসুমে তাঁকে জলদস্যুদের তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এরপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবার ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সুন্দরবনে এসেছেন।
শুঁটকি ব্যবসায়ী মোয়াজ্জেম শেখ জানান, গত মৌসুমে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর লোকসান হয়েছে ১০ লাখ টাকা। এবার নতুন করে ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন।
একইভাবে ব্যবসায়ী তায়েব আলী শেখ গত বছর আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ২০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন। এবার ঋণ নিয়েছেন ৩৫ লাখ টাকা। মাসুম শেখও গত মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে উঠতে নতুন করে ৩৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন। এনামুল হক ৪০ লাখ এবং জিয়া শেখ ৪৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার শুঁটকি উৎপাদনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
তিন শতাধিক মহাজনের প্রায় সবাই ঋণগ্রস্ত
সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকার বাসিন্দা ও আলোরকোলের চাকলা মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রউফ মেম্বার জানান, তাঁদের সমিতির তিন শতাধিক বহদ্দারের প্রায় ৯০ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। গত মৌসুমে তাঁর নিজের ১২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। জেলে ও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করতে ১১ কাঠা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। এবার ব্যাংক ও ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিয়ে মোট ২০ লাখ টাকা পুঁজি সংগ্রহ করেছেন।
তিনি আরও জানান, গত মৌসুমে দস্যুদের চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় অনেক জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। পরে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাঁদের ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। প্রতি নৌকা ও ট্রলারের বিপরীতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নির্ধারণ করে দস্যুরা। এসব কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা এবং বড় ব্যবসায়ীদের ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে।
ঋণের চাপ সামলাতে না পেরে ইতোমধ্যে চাকলা সমিতির ১৭ জন ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
দস্যু আতঙ্কে সাগরে জেলেরা
দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রায় ১০০ বছর ধরে দুবলার চরের চারটি অস্থায়ী শুঁটকিপল্লিতে মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন হয়ে আসছে। দেশ-বিদেশে এখানকার শুঁটকির সুনাম রয়েছে। কিন্তু বনদস্যুদের তৎপরতায় বর্তমানে এই ব্যবসা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জেলেদের অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। পরে মুক্তিপণ দিয়ে তাঁদের উদ্ধার করতে হয়েছে। শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে ১০ হাজারের বেশি জেলের জীবন-জীবিকা জড়িত। দস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না গেলে এবারও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, এসআরবি ও কোস্ট গার্ডের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকেই দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং রাতে কোস্ট গার্ডের সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এবার ভাসমান হাসপাতালে মিলবে চিকিৎসাসেবা
দুবলার চরের শুঁটকিপল্লির জেলে-মহাজনদের জন্য এবারই প্রথম সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দিতে ভাসমান ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের উদ্যোগে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের আনা-নেওয়ার জন্য রাখা হয়েছে স্পিডবোট।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক টন
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে দুবলার চারটি শুঁটকিপল্লি থেকে ৭ হাজার ৯৬০ দশমিক ২৭৬৬ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। এ থেকে সুন্দরবন বিভাগ রাজস্ব পেয়েছিল প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা।
এবার সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদন এবং প্রায় ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের প্রত্যাশা করছে বন বিভাগ।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দস্যুতা দমনে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। জেলেরা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক টহলে থাকবে কোস্ট গার্ড
কোস্ট গার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, শুঁটকি আহরণ মৌসুমকে কেন্দ্র করে মৎস্যজীবীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, কোস্ট গার্ডের জাহাজ, বোট ও বিশেষ টহল দল দুবলার চর, আলোরকোল, কটকাসহ আশপাশের সাগর, নদী ও চ্যানেলে সার্বক্ষণিক টহল পরিচালনা করবে। বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণ প্রতিরোধে কোস্ট গার্ড সক্রিয় থাকবে।
নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা বা দস্যুতার ঘটনা ঘটলে দ্রুত সহায়তা পেতে জেলে-মহাজনদের কোস্ট গার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে নতুন মৌসুম ঘিরে দুবলার চরে এখন কর্মচাঞ্চল্য। তবে জেলে-মহাজনদের চোখে-মুখে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন থাকলেও বুকের ভেতর রয়ে গেছে জলদস্যুর আতঙ্ক ও ঋণের বোঝা। তাঁদের প্রত্যাশা, এবার নিরাপদে মাছ আহরণ করতে পারলে শুঁটকি বিক্রির আয় দিয়ে অন্তত পুরোনো ঋণের বোঝা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।








