বাগেরহাট জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদী ও খালের ওপর ২১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১১টি নতুন সেতু-কালভার্টে নেই সংযোগ সড়ক। ফলে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সড়ক যোগাযোগ দ্রুত ও নিরাপদ করতে নির্মিত এসব সেতু-কালভার্টের মধ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ১০টি এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি কালভার্ট রয়েছে।
এর মধ্যে সওজের সাইনবোর্ড-মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা আঞ্চলিক মহাসড়কের বারুইখালী, নলবুনিয়া, তাফালবাড়ি ও শ্যামব্যাপারী খালের ওপর ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি বড় সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাগেরহাট-ডেমা-রামপাল-মোংলা সড়কে বিভিন্ন নদীর ওপর ১৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ছয়টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
তবে সেতুগুলো নির্মিত হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে প্রতিদিন শত শত যানবাহনকে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো বেইলি সেতু ও মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে নতুন সেতু নির্মাণের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে এ দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু ও মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সাইনবোর্ড-মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং বাগেরহাট-ডেমা-রামপাল-মোংলা সড়কে চলাচলকারী একাধিক যাত্রীবাহী পরিবহন, ট্রাক ও পিকআপের চালকেরা জানান, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের এসব সড়কে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু ও মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। নতুন সেতু নির্মিত হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় তাঁরা কোনো সুফল পাচ্ছেন না। ফলে এসব সেতু নির্মাণের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।
বাগেরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, বিগত ড. ইউনূস সরকারের আমলে নির্মিত এসব সেতুর সংযোগ সড়কের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিদিন এসব এলাকার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু ও মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী রবিউল আলমের নিজ জেলা বাগেরহাটে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়া শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সড়ক বিভাগের নির্মিত সব সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হলে দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের অবসান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের কাকারবিল এলাকায় এলজিইডির একটি কালভার্টেও সংযোগ সড়ক নেই। ২৮ লাখ ২৯ হাজার ৮০১ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫ দশমিক ৫০ মিটার দীর্ঘ কালভার্টটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার চার মাস পেরিয়ে গেলেও তৈরি হয়নি কোনো সংযোগ সড়ক। ফলে কালভার্ট থাকলেও তাতে ওঠার কোনো পথ নেই। বিকল্প পথ না থাকায় প্রতিদিন পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে পাঁচ গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষকে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে স্কুলশিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্করা।
কাকারবিল এলাকার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন ও তোবা জানায়, খালের ওপর কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও দুই পাশে মাটি দিয়ে উঁচু করে সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়নি। ফলে তারা খাল পার হতে পারে না। স্কুলে যাওয়া-আসার সময় তাদের পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চায় তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা সাবিনা আক্তার বলেন, “কাকারবিল সড়ক দিয়ে পাঁচ গ্রামের মানুষ চলাচল করে। আমার দুই ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ে। একজনকে সকাল ৯টায় স্কুলে দিয়ে আসতে হয়, আরেকজনকে দুপুর ১২টায়। দিনে চারবার আমাকে পানির মধ্য দিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়। কিছুদিন আগে এখান থেকে পড়ে গিয়ে সন্তানের বইও পানিতে ভিজে গেছে। আমরা কালভার্টের সংযোগস্থল সংস্কার চাই।”
বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদ জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাকারবিল কালভার্টের সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ কালভার্ট নির্মাণের বিল আটকে রাখা হবে।







