নদীতে মাছ ধরে সংসার চালানো বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে একদিন দেশের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে দেখা। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় সাফল্য অর্জন করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থী লিকা পোদ্দার। ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে নারী এককের শিরোপা জিতে নিজের প্রতিভা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ২৪ বছর বয়সী লিকা ফাইনালে সাবেক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চ্যাম্পিয়ন উর্মি আক্তারকে পরাজিত করেন। তিন সেটের লড়াইয়ে ২২-২০, ১১-২১ ও ২১-১৮ পয়েন্টে জয় নিশ্চিত করে প্রথমবারের মতো সিনিয়র জাতীয় পর্যায়ের শিরোপা অর্জন করেন তিনি। পাঁচ বছরের সিনিয়র ক্যারিয়ারে এটি তাঁর অন্যতম বড় সাফল্য।
লিকার ব্যাডমিন্টন যাত্রার সূচনা ২০১৯ সালে মোংলায়। একটি পুরোনো সিনেমা হলের ভেতরে তৈরি করা ছোট্ট কোর্টে কোচ মিলন সরদার জুসের তত্ত্বাবধানে তাঁর নিয়মিত অনুশীলন শুরু হয়। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও প্রায় তিন থেকে চার বছর সেখানে অনুশীলন করে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।
পরবর্তী সময়ে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য দিনাজপুরের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান লিকা। পাশাপাশি এলোরো শাটলিন একাডেমি, কাওয়াসাকি ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ এবং কোচদের সহযোগিতা তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে জাতীয় পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথটি সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং পড়াশোনার চাপ সামলে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। নদীতে মাছ ধরে পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেন তাঁর বাবা। এমন বাস্তবতায় খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়াও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও পরিবারের সমর্থন ও নিজের দৃঢ় মনোবল তাঁকে স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হতে দেয়নি।
জাতীয় পর্যায়ে প্রথম সিনিয়র শিরোপা জয়ের অনুভূতি জানাতে গিয়ে লিকা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। গত পাঁচ থেকে ছয় বছর জাতীয় পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জনের পর অবশেষে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।
এবারের প্রতিযোগিতায় ছেলে বিভাগে ৫১২ জন এবং মেয়ে বিভাগে ৮৩ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। নকআউট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছানো এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা নিশ্চিত করাকে নিজের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন লিকা।
পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে সমন্বয় রাখাও তাঁর জন্য ছিল আরেকটি বড় পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা এবং জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। এ বিষয়ে লিকার প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলোয়াড়দের জন্য আরও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, দক্ষ কোচ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে।
নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে লিকার পরামর্শ, সফল হতে হলে নিয়মিত অনুশীলন, শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকা জরুরি। তাঁর মতে, একদিনে বড় সাফল্য আসে না; এর পেছনে প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের অধ্যবসায় ও নিরলস প্রচেষ্টা।
লিকার এই অর্জনে গর্ব প্রকাশ করেছে যবিপ্রবি প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা দপ্তরের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. অভিতু কিবরিয়া বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তাঁর এই সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গর্বিত ও আনন্দিত। ভবিষ্যতেও তিনি ভালো করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গন নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় যবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে ভালো করছেন। তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রীড়াক্ষেত্রে আরও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় পর্যায়ে শিরোপা জয়ের পর এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখছেন লিকা। মোংলার একটি ছোট্ট অনুশীলন কোর্ট থেকে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে উঠে আসার এই গল্প শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, বরং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।









