পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) নিজের ছেলেসহ অতিরিক্ত ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ও সাবেক রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. সন্তোষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চার বছর পর দায়ের করা এ মামলায় সরকারের ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ১৩১ টাকা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুদকের পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ও সাবেক রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসু পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগে অনিয়ম করেন। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত পদের অতিরিক্ত পদে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে অভিযুক্তরা বাছাই বোর্ডের সদস্যদের অবৈধভাবে প্রভাবিত করেন। পরে সাবেক উপাচার্যের ছেলেসহ অন্যদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে রিজেন্ট বোর্ডের রেজুলেশন তৈরি ও অনুমোদন করা হয়। এর মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাকরি দেওয়া হয়।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ১৩১ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে নিজেদের এবং অন্যদের লাভবান করার উদ্দেশ্যে এসব অনিয়ম করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ও সাবেক রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর পবিপ্রবিতে নয়টি পদে ২১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে সেকশন অফিসার পদে তিনজন নিয়োগের চাহিদা থাকলেও অতিরিক্ত আরও তিনজনসহ মোট ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের ছেলে শাওন চন্দ্র তনুও রয়েছেন।
একই বিজ্ঞপ্তিতে বুক বাইন্ডার, কিচেন হেলপার, অ্যাটেনডেন্ট, হেলপার ও মালী—এই পাঁচটি পদে একজন করে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত পাঁচজনসহ মোট ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইভাবে অফিস সহায়ক পদে পাঁচজনের পরিবর্তে অতিরিক্ত পাঁচজনসহ মোট ১০ জন এবং ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট পদে তিনজনের বিপরীতে অতিরিক্ত তিনজনসহ মোট ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
মামলায় দুদক আরও উল্লেখ করেছে, একই বছরের ১৭ অক্টোবর প্রভাষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পবিপ্রবি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে কৃষিতত্ত্ব বিভাগে একটি পদে নিয়োগের কথা উল্লেখ থাকলেও অতিরিক্ত একজনসহ মোট দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া একই বছরের ২৬ মে প্রকাশিত আরেকটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সাতটি পদে প্রভাষক নিয়োগের কথা বলা হয়। সেখানে পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগে একটি পদে নিয়োগের চাহিদা থাকলেও অতিরিক্ত আরও একজনসহ মোট দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
দুদকের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পবিপ্রবিতে পৃথক তিনটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এ কারণে অতিরিক্ত নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকার ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ১৩১ টাকা আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ওই সময় সাবেক উপাচার্য ও কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত নিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক রেজিস্ট্রার ড. সন্তোষ কুমার বসু নিয়োগ বোর্ডের সদস্যসচিব ছিলেন। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তাঁদের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাছাই কমিটিকে প্রভাবিত করা হয়। এর মাধ্যমে স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের ছেলে শাওন চন্দ্র তনুসহ মোট ১৮ জনকে অতিরিক্ত নিয়োগ দেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বাদী দুদকের পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক তাপস বিশ্বাস বলেন, “পবিপ্রবিতে অতিরিক্ত নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাটি অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ও সাবেক রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসুকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পর আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।”
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর পবিপ্রবির সাবেক উপাচার্য ড. স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, রেজিস্ট্রার ড. সন্তোষ কুমার বসুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে সাবেক রেজিস্ট্রার ড. সন্তোষ কুমার বসুর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। অপর আসামি সাবেক উপাচার্য ড. স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করতে না পারায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।









