প্রবারণা পূর্ণিমা রাখাইন সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। এ উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও সোমবার দিনভর নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার রাখাইন জনগোষ্ঠী। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ সন্ধ্যার পর আকাশে ফানুস ওড়ানো। এ উপলক্ষে উপজেলার ২৮টি রাখাইন পল্লীর বৌদ্ধমন্দির ও বিহার পরিচালনা কমিটিকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। উৎসবকে ঘিরে রাখাইন পল্লীগুলোতে বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ।
কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, সকাল থেকেই রাখাইন নারীরা বৌদ্ধবিহারে উপস্থিত হয়ে পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। এ সময় নানা ধরনের পিঠা দান এবং সবার মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা করা হয়। ভিক্ষুসংঘের পক্ষ থেকে ধর্মীয় উপদেশমূলক আলোচনা করা হয়। সন্ধ্যায় নাচ-গানের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ফানুস ওড়ানোর আয়োজন করা হয়েছে। বিহারের চারপাশে জ্বালানো হয়েছে হাজারো প্রদীপ। এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত এ উৎসব চলবে।
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে উপজেলার বৌদ্ধবিহারগুলো নতুন সাজে সাজানো হয়েছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন রাখাইন পল্লীতে তৈরি করা হয়েছে নানা ধরনের বাহারি পিঠাপুলি ও পায়েস।
বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এটি আশ্বিনী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এ উৎসব পালিত হয়।
তিনি বলেন, ‘প্রবারণা শব্দের পালি আভিধানিক অর্থ নিমন্ত্রণ, আহ্বান, মিনতি, অনুরোধ, নিষেধ, ত্যাগ, শেষ, সমাপ্তি, ভিক্ষুদের বর্ষাবাসের পরিসমাপ্তি, বর্ষাবাস ত্যাগ, ত্যাগের কার্য কিংবা শিষ্টাচার, বিধি, তৃপ্তি বা সন্তুষ্টির বিষয়। এর সঙ্গে ক্ষতিপূরণ, প্রায়শ্চিত্ত ও ঋণ পরিশোধের ধারণাও যুক্ত।’
তিনি আরও জানান, বর্ষাবাস সমাপনের পর ভিক্ষুরা নিজেদের দোষত্রুটি অন্য ভিক্ষুদের কাছে প্রকাশ করেন এবং সেসবের প্রায়শ্চিত্তের বিধান চান। এমনকি অজ্ঞাতসারে কোনো অপরাধ করে থাকলেও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, এটিই প্রবারণার অন্যতম তাৎপর্য।
এদিন বুদ্ধের চুলধাতুর স্মরণে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে কাগজের ফানুস তৈরি করা হয়। ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে চুলামণি চৈত্যের পূজার উদ্দেশ্যে আকাশপ্রদীপ হিসেবে ফানুস ওড়ানো হয়। এ সময় ধর্মীয় গাথা ও মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফানুস উৎসর্গ করেন। সাধু ধ্বনির মধ্য দিয়ে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হয় ফানুস।
প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উপলক্ষে সোমবার, ২৬ অক্টোবর, কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারেও নানা আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম রাতে অন্তত ১০ থেকে ১২টি ফানুস ওড়ানো হবে বলে জানান বিহারাধ্যক্ষ।
প্রবারণা পূর্ণিমার ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরে ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো বলেন, গৌতম বুদ্ধের চুল কর্তন, স্বর্গে মাতা মহামায়াকে ধর্মদেশনা প্রদান এবং ৬০ জন ভিক্ষুকে ধর্ম প্রচারে পাঠানোর স্মৃতির সঙ্গে এ দিনটি জড়িত।
মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উত্তম ভিক্ষু জানান, সোমবার সকাল ৭টায় ধর্মীয় প্রার্থনা এবং শীল প্রদান ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে দিনটির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দিনভর ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও তৈরি করা হয় নানা ধরনের পিঠাপুলি ও সুস্বাদু খাবার। সন্ধ্যার পর অধিকাংশ রাখাইন পল্লীতে ঐতিহ্যবাহী ফানুস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম রাতে তাঁরা অন্তত ১০টি ফানুস ওড়াবেন। তবে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কারণে ওই পল্লীর রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এখনো মানসিকভাবে স্বস্তিতে ফিরতে পারেননি বলে জানান তিনি।
বেতকাটা রাখাইন পল্লীর বাসিন্দা ও ধর্মবিজয় বৌদ্ধবিহারের সভাপতি মংচো জানান, প্রথম দিন তাঁরা ১০ থেকে ১২টি ফানুস ওড়াবেন। গোড়া আমখোলা রাখাইন পল্লীর বিজয়রামা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ সুচিন্ত মহাথেরো জানান, তাঁদের বিহার থেকেও অন্তত ১০টি ফানুস ওড়ানো হবে।
দিয়রামখোলা পাড়ার বাসিন্দা রাখাইন নেতা মংম্যা জানান, তাঁদের পল্লীতে মাত্র চারটি পরিবারের বসবাস। তারপরও তাঁরা চার থেকে পাঁচটি ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে উপজেলার রাখাইন পল্লীগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সাগরপারের রাখাইন সম্প্রদায়ের আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে ঘিরে নারী-পুরুষ ও শিশুদের মধ্যে দেখা গেছে উৎসাহ-উদ্দীপনা। অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
আগের সেই জৌলুস নেই
একসময় এ জনপদকে মানববসতির উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল রাখাইন সম্প্রদায়। তখন প্রতিটি পল্লীতে টানা তিন রাত ধরে ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত ফানুস ওড়ানো হতো। ফানুসের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত আকাশ। তারার মতো জ্বলজ্বল করত সাগরপারের রাতের আকাশ। সেই দৃশ্য এখন তাঁদের কাছে হারানো অতীত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাখাইন সম্প্রদায় ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে। একসময়কার শতাধিক রাখাইন পল্লী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। চাষের জমি থেকে শুরু করে বৌদ্ধবিহার, রাখাইন পাড়া ও শ্মশান পর্যন্ত দখলের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অনেক রাখাইন পরিবার নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ফলে প্রবারণা পূর্ণিমার রাতে এখন আর আগের মতো আকাশজুড়ে ফানুসের আলো দেখা যায় না। হারিয়ে গেছে উৎসবের সেই জৌলুস। তারপরও নানা প্রতিকূলতা ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় রীতি মেনে উৎসবটি পালন করছেন রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ। উৎসব আয়োজনের জন্য তাঁদের সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় ফানুস তৈরিতেও নানা সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাখাইন নেতারা।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানান, রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে প্রবারণা পূর্ণিমার বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম ও মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হাওলাদার জানান, রাখাইন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ নিয়ে কোনো ধরনের শঙ্কা নেই।








