কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয়েছে ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬’। ২৩ ও ২৪ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। উৎসবমুখর পরিবেশে সৈকতজুড়ে ছিল মানুষের পদচারণা। তবে কার্নিভাল ঘিরে পর্যটকদের ভিড় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি আয়োজকদের ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা, তথ্যসেবার ঘাটতি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাও হয়েছে।
শনিবার রাতে সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পর্যটন কার্নিভাল। রোববার সকালে সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির মাধ্যমে শেষ হয় আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশ নেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানসহ স্থানীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
কার্নিভাল চলাকালে কুয়াকাটায় পর্যটক-দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবারের আয়োজন ঘিরে সৈকতে বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত ও বিভিন্ন উৎসবমুখর আয়োজন দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
শুক্রবার রাত ও শনিবারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পী সাদ্দাম মাল, নিজাম উদ্দিন, আলমাস সিকদার ও মাসুদ পারভেজ সাগরসহ অন্য শিল্পীরা পরিবেশনা করেন। তাঁদের পরিবেশনা উপভোগ করেন উপস্থিত দর্শনার্থীরা। এ ছাড়া দেশবরেণ্য তারকা হাসানের উপস্থিতি উৎসবে বাড়তি আনন্দ যোগ করে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্টি
এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের মধ্যেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্থানীয়রা। পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে আয়োজনটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের তদারকি ও পরিশ্রমের কথাও উল্লেখ করেছেন আয়োজনে অংশ নেওয়া ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কারণে বড় এ আয়োজন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা
কার্নিভাল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও আয়োজনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা দেখা গেছে। বিশেষ করে তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়া, ম্যারাথন আয়োজনের ব্যবস্থাপনা, অতিথিদের উপস্থিতি ও অনুষ্ঠানস্থলের জায়গার সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
আয়োজনে বিভিন্ন তারকা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির অংশগ্রহণের প্রচার করা হলেও তাঁদের কাউকে কাউকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে আগত অতিথি ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
দুই দিনের আয়োজন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে এসব অসংগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় উদ্যোক্তা, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পর্যটকেরা।
হোটেল-রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
কার্নিভাল ও টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটায় পর্যটকদের বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এ সুযোগে আবাসিক হোটেল, খাবারের হোটেল এবং স্থানীয় যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
পর্যটকদের অভিযোগ, স্বাভাবিক সময়ে যে কক্ষ তুলনামূলক কম ভাড়ায় পাওয়া যেত, কার্নিভাল চলাকালে তার ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একইভাবে কুয়াকাটার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাতায়াতের জন্য অটোরিকশা, টমটম ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, পর্যটন উৎসবের আয়োজনের পাশাপাশি আবাসন, খাবার ও যাতায়াতের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, তাঁরা আয়োজকদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছেন। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগ
কার্নিভাল চলাকালে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের কারণে সৈকতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে সমুদ্রদূষণের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সফিক জামান নামের একজন তাঁর পোস্টে সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, এভাবে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত থাকলে বঙ্গোপসাগরও একসময় বুড়িগঙ্গার মতো দূষিত হয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
কার্নিভাল ঘিরে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও পরিবেশ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ
কার্নিভালের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আসাদুল্লাহ হাসান মুসা তাঁর পোস্টে হোটেলভাড়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, যে হোটেলে আগে ৬০০ টাকায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকা যেত, সেখানে এখন নন-এসি কক্ষের জন্যও ১ হাজার ৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক কর্মী জনি আলমগীর তাঁর পোস্টে কার্নিভাল আয়োজনের ব্যয় ও কুয়াকাটার পর্যটন উন্নয়নে এর বাস্তব অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এ ছাড়া আয়োজক অনন্য মামুনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সমালোচনা দেখা গেছে। কার্নিভালের বিভিন্ন আয়োজন, প্রচার এবং ব্যবস্থাপনার অসংগতির অভিযোগ তুলে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আয়োজনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
পর্যটন কার্নিভাল ঘিরে কুয়াকাটায় বিপুল মানুষের সমাগম, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার সফলতা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে পর্যটকদের তথ্যসেবা, আবাসন ও যাতায়াতের ভাড়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ইভেন্ট পরিচালনায় সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে ওঠা অভিযোগ ভবিষ্যতের আয়োজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পর্যটন কার্নিভালের প্রকৃত সাফল্য কেবল দর্শনার্থীর সংখ্যা কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা, যৌক্তিক ভাড়া বজায় রাখা, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে আরও সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।









