সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শুধু হত্যা নয়, মাদকসংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগেও দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ এই সাজা। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতনের অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। বিশেষ করে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশি নাগরিক। তবে ওই সময় কতজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।
এক দশকে মৃত্যুদণ্ড বেড়েছে প্রায় চার গুণ
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিসংখ্যান বলছে, সৌদি আরবে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ড ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৪৫। আর ২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ছিল ৯০।
অর্থাৎ, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা প্রায় চার গুণে পৌঁছেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সাজা ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধে।
ইএসওএইচআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাগুলোও পরিস্থিতির উন্নতির পরিবর্তে উদ্বেগের ধারাবাহিকতাই তুলে ধরছে।
কোন আইনে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড?
সৌদি আরবে সব অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারণকারী একটি পূর্ণাঙ্গ দণ্ডবিধি নেই। দেশটির বিচারব্যবস্থায় ইসলামি শরিয়াহ ও ফিকহের ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে বিচারকেরা অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে শাস্তি নির্ধারণ করেন।
ইসলামি আইন অনুযায়ী, অপরাধ ও শাস্তির ক্ষেত্রে হদ, কিসাস ও তাজির—এই তিনটি শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ।
হদ হলো নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি। কিসাস মূলত হত্যা বা শারীরিক আঘাতের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নির্দিষ্ট শর্তে ভুক্তভোগী বা নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা ক্ষমা করতে কিংবা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারেন।
অন্যদিকে, তাজিরের ক্ষেত্রে অপরাধের শাস্তি নির্ধারণে বিচারকের বিবেচনামূলক ক্ষমতা রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এই ক্ষমতার প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকায় মৃত্যুদণ্ডের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে।
সৌদি আরবের ২০০৫ সালের মাদকবিরোধী আইন এবং ২০১৭ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনেও নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মাদক অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড, প্রশ্ন মানবাধিকার সংস্থার
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ মাদকসংক্রান্ত অপরাধে এই সাজা প্রয়োগ।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের ৮৬২টির ভিত্তি ছিল তাজির। এর মধ্যে ৫৯৭টি ছিল শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে।
২০২১ সালে সৌদি কর্তৃপক্ষ মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে ২০২২ সালের শেষ দিকে আবার এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু হয়।
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নথিবদ্ধ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৭১টি ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধে। অর্থাৎ, ওই সময়ের মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কার্যকর হয়েছে মাদকসংক্রান্ত মামলায়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রশ্ন, হত্যা না করেও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলোতে আসামিদের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। পরে সেই স্বীকারোক্তি আদালতে আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়নি বলেও সংস্থাগুলোর দাবি।
সৌদি আরবের আইনে আসামিদের আইনজীবীর সহায়তা, আপিল এবং নির্যাতন থেকে সুরক্ষার মতো অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলোতে এসব অধিকার সব সময় কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হয় না।
এ ছাড়া বিচারপূর্ব আটক, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার অভিযোগও রয়েছে।
বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ডের হার বেশি
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১২২ জনের মধ্যে ৯২ জনই ছিলেন বিদেশি নাগরিক। ২০২৫ সালে এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অন্তত ২৪০ জনের মধ্যে ১৮৮ জন বিদেশি।
অন্যদিকে, ইএসওএইচআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ৫৯ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকও রয়েছেন।
সৌদি আরবে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের উচ্চ হার নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অসুবিধা বিদেশি আসামিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি বাধা তৈরি করতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগাম খবরও পান না পরিবার
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বন্দি ও তাঁদের পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বন্দিরা তাঁদের মামলা পুনর্বিবেচনার অপেক্ষায় ছিলেন। এমনকি সাজা স্থগিত বা পুনর্বিচারের আশ্বাস পাওয়ার পরও তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে অবশ্যই আগাম জানাতে হবে—এমন স্পষ্ট নিশ্চয়তা আইনে নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অনেক পরিবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বজনের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না।
কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করা কিংবা দাফনের স্থান সম্পর্কে তথ্য না দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
এ ধরনের পরিস্থিতি বন্দিদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতায় কতটা পরিবর্তন?
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিভিন্ন সময়ে বিচারব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলেছেন। বিশেষ করে হত্যা ছাড়া অন্য অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সীমিত করার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা কমার পরিবর্তে বেড়েছে।
ইএসওএইচআরের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নথিবদ্ধ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৪টি কার্যকর হয়েছে তাজিরের ভিত্তিতে। সংস্থাটির শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ওই সময় হত্যা, মাদক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত এবং অন্যান্য অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ও অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠন সৌদি আরবকে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সীমিত করা, নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণেও মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগে স্বচ্ছতা, বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি, বিচারপ্রক্রিয়া, আইনি সহায়তা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ধরনের ঘটনায় পরিবারের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা শুধু শাস্তির কঠোরতা নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আসামির অধিকার এবং বিদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষ করে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য এসব বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলোয় ২৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের উদ্ধৃত তথ্য।









