মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: বড় বালিয়াতলী গ্রামের বৃদ্ধ শাহজাহান মিয়া আজও ২০০৭ সালের প্রকৃতির বুলডোজার খ্যাত সুপার সাইক্লোন সিডর তান্ডব ভুলতে পারেন নি। আশ্রয়কেন্দ্র অনেক দুরে থাকায় পরিবারের সকলকে চরম ঝুঁকি নিয়ে বাড়ির দেড় তলা টিনশেড ঘরে ছিলেন। কোনমতে রক্ষা পেয়েছেন। তবে ঘরটির ক্ষতি হয়েছে। শাহজাহান মিয়া এখন ঘুর্ণিঝড়কালীন আশ্রয় নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত। এখন আর নেই দুর্ভাবনা। পাঁচ মিনিটের পথ পেরিয়ে যেতে পারেন এমন দুটি বহুতল আধুনিক বহুমুখি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বড়বালিয়াতলী গ্রাম ছাড়াও আশপাশের অন্তত তিন হাজার মানুষ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ রয়েছে। একই মন্তব্য লেমুপাড়া আদর্শ গ্রামের নুর আলমের। সিডরে প্রায় দেড় কিলোমিটার দুরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ইয়াকুব আলী তালুকদার ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, তার এখানে দু’টি ছাড়াও বড় বালিয়াতলীতে আরও একটি বড় বহুতল আশ্রয়কেন্দ্র কাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে।
ধুলাসার ইউনিয়নের গঙ্গামতি এলাকার বেড়িবাঁধের বাইরের মানুষকে এক সময় খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে পৌছতে হতো চার/পাঁচ কিলোমিটার দুরের চাপলী বাজারে। এখন সেই গঙ্গামতির প্রায় দেড় হাজার পরিবারের দুর্ভোগ আর চরম ভোগান্তি নেই। গার্ডার ব্রিজ হয়েছে। পাকা সড়ক হয়েছে। হয়েছে দুটি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার। সিডরে আশ্রয় নেয়ার সক্ষমতা ছিল না। চেয়ারম্যান মো.হাফেজ আব্দুর রহিম আকন জানালেন, এখানে সিডরের জলোচ্ছ¡াসে মারা গেছে পাঁচ জন। এখন একটি আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও একটা স্কুল নির্মাণ করা হয়েছে। মানুষ দুর্যোগকালীন আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। গঙ্গামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশীষ কীর্তনীয়া জানান, আট বছর আগেও তিন শতাধিক শিশুর চরম দুর্ভোগ ছিল। এখন স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার করা হয়েছে। করা হয়েছে পাকা রাস্তা। দুর্যোগ ঝুঁকি কেটে গেছে। গঙ্গামতির জেলে পরিবারগুলো নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারছে। তাদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে।
লালুয়ার শিক্ষানুরাগী মিয়া মোহাম্মদ চান খান জানান, তাদের এলাকার মানুষ এখন দুর্যোগকালীন ঝুঁকি থেকে অনেকটা মুক্ত। নীলগঞ্জের ইসলামপুর গ্রামের মানুষ জানালেন, সিডরের সময় কোন আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় এখানকার তিনটি গ্রামের মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে বাড়িঘরে অবস্থান করেছিলেন। বহু ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল। এখন বহুতল একটি আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে স্বাচ্ছন্দে শিশু শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করছে। এছাড়া ইসলামপুর, নেয়ামতপুর, ছলিমপুরের মানুষ দূর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। গৈয়াতলা গ্রাম সংলগ্ন বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে জলোচ্ছাসে দুই শিশুর প্রানহানি ঘটেছিল সেখানে। নীলগঞ্জ ইউনিয়নে তখন মোট আট জনের প্রানহানি ঘটে। সিডরের তান্ডবে মানুষ চরম বিপদশঙ্কুল পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল। তখন কোন আশ্রয় কেন্দ্র ছিল না। বর্তমানে সেখানে দক্ষিণ গৈয়াতলা স্কুল কাম বহুমুখি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে।
কলাপাড়া পৌরশহরের নাচনাপাড়ায় কোন সাইক্লোন শেল্টার না থাকায় সিডরের সময় মানুষ বিভিন্ন বাড়িঘর, হাসপাতালে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। পিযুষ কান্তি বিশ্বাস জানান, সিডরে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শেখর চন্দ্র কীর্তনীয়া জানালেন, তিনি সপরিবারে দেড় কিলোমিটার দুরে হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছেন। বাড়ি থেকে আশ্রয়ে যাওয়ার সময় আব্দুস সালামের মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুকন্যা রুমি স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে মারা গেছে। আরতী রাণী জানান, তার দাদি মাকে ভাসিয়ে বেড়িবাঁধের কাছে নিয়ে গেছিল। রহিমা বেগম জানালেন, দিশেহারা হয়ে সিডরে পরিবারের চারজনকে নিয়ে উত্তর নাচনাপাড়া এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এসব মানুষসহ গ্রামটির প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষ এখন বাসন্তী রাণী মন্ডল স্কুল কাম আশ্রয় কেন্দ্রে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারেন। এদের দূর্যোগে আশ্রয় ঝুকি কেটে গেছে। এভাবে চাকামইয়ার কাছিমখালী গ্রামে একটি বহুতল আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। চরচাপলী গ্রামটিতে সবচেয়ে ঘনবসতি মানুষের বসবাস। সাগরের কোলঘেষে গ্রামটি। এখানকার একটিমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ছিল। ছিল জরাজীর্ণ একটি আশ্রয়কেন্দ্র। সিডরে সেখানকার তিনজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আশ্রয়ের সংকুলান হতো না। বর্তমানে একটি আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার করেছে এলজিইডি বিভাগ। মোট কথা সিডরের সময়ে এ জনপদের মোট জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ মানুষও নিরাপদে আশ্রয় নেয়ার মতো কোন সুযোগ ছিল না। ভয়াল ওই সিডর কলাপাড়ার ৯৪ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। এখনও নিখোঁজ রয়েছে সাত জেলে। সরকারি উপজেলা প্রশাসনের সক্ষমতা ছিলনা সকল মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টির। কিন্তু সিডর পরবর্তী সময় সাগরপারের দূর্যোগের গ্রাসে থাকা জনপদে সরকারিভাবে এবং বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা দূর্যোগকালীণ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মানের কাজ শুরু করে। আজ দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২৫। ‘ সমন্বিত উদ্যোগ প্রতিরোধ করি দুর্যোগ’ এমন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষ্যে সারা দেশের মতো কলাপাড়ায় র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই দিবসের স্লোগানের যথার্থতা মেলে সাগরকূলের কলাপাড়ার এই জনপদে সরকারি এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে যেমনি দুর্যোগ প্রশমনে মানুষকে সচেতনতার কাজ করে যাচ্ছে। তেমনি বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে দুর্যোগ মোকাবেলায়। যার ইতিবাচক দিক রয়েছে লক্ষণীয়। কারণ এখন দুর্যোগ মোকাবেলায় মানুষ বহুগুনে সচেতন হয়েছেন।
বিভিন্ন তথ্যসুত্রে জানা গেছে, সিডরের পরে স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডি) কলাপাড়ায় ২৭ টি স্কুলকাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। এখনো কয়েকটির নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় পাঁচটি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ১০টি স্কুল, পাঁচটি মাদ্রসা ও তিনটি কলেজ কাম আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেভ দি চিলড্রেন একটি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। মেরামত করেছে ১১টি। আমেরিকান নৌবাহিনী করেছে তিনটি। কারিতাস নির্মাণ করেছে মোট ৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র। এর মধ্যে আধুনিক বহুমুখি সুবিধা সংবলিত রয়েছে আটটি আশ্রয় কেন্দ্র। যেখানে একেকটিতে ৫০০- সহস্রাধিক মানুষ দূর্যোগকালে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়ও ফায়েল খায়ের প্রতিষ্ঠান তিনটি এবং হীড বাংলাদেশ, গুড নেইবারস বাংলাদেশ একাধিক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। মোট কথা কলাপাড়ায় অন্তত ৮২টি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র সিডরের পরে নির্মাণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা চুড়ান্ত রয়েছে অন্তত আরও কয়েকটি নির্মাণের। এছাড়ও পর্যটন এলাকা কুয়াকাটায় আধুনিক মানের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় এক শ’ বহুতল স্থাপনা রয়েছে। যেখানে দূর্যোগকালে ওখানকার সকল মানুষ আশ্রয়ের সুযোগ পাচ্ছে। রয়েছে সরকারি বেসরকারি অফিস ভবন, পাকা-আধা পাকা বাড়িঘর। মোট কথা কলাপাড়ার প্রায় তিন লাখ মানুষের অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখন দূর্যোগকালে নিরাপদে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের ফলে।
সাগরপারের কলাপাড়ার এই জনপদে সিডরকালের পরিস্যংখ্যান মতে মাত্র ৫০ হাজার ২০০ মানুষ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ ছিল। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাম আশ্রয় কেন্দ্র ছিল ৮০টি। এর মধ্যে ১৭টি ছিল ব্যবহার অনুপযোগী।
কলাপাড়া উপজেলা ঘুর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূরি (সিপিপি) সহকারী পরিচালক আছাদুজ্জামান খান জানান, সিডর পরবর্তী সময় ধারাবাহিকভাবে উপক‚লীয় কলাপাড়ায় পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র করা হয়েছে। দূর্যোগকালে একটি মানুষও যেন নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে না থাকে এমন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব স্থাপনা বহুমুখি সুবিধা সংবলিত করা হচ্ছে। আরও প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সকল মানুষকে দূর্যোগঝুকি থেকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। তিনি এও জানান, ঘুর্ণিঝড়ের সময় কলাপাড়ায় অন্তত পৌণে দুই শ’ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। যেখানে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ দুর্যোগকালে আশ্রয় নিতে পারেন। সর্বশেষ রেমাল ঘুর্ণিঝড়ে কলাপাড়ায় এ পরিমাণ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। এছাড়া ২০টি মুজিব কিল্লা প্রস্তু রাখা থাকে যেখানে গবাদিপশু দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পারে। কলাপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোকসেদুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে এখনো আরও এক শ’ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানগণ জানিয়েছেন। এছাড়া বহু আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো সংযোগ সড়ক এবং দুর্যোগকালীন বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে ইউপি চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন খান দুলাল জানিয়েছেন।









