মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: প্রবারণা পূর্ণিমা। রাখাইনদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আর এই তিঁথিতে বরাবরের মতো এবছরও সোমবার সকাল থেকে দিনভর বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করেছে কলাপাড়ার রাখাইন জনগোষ্ঠী। আজ রাতে শেষ হবে এ উৎসব। অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সন্ধ্যার পরে আকাশে ফানুস ওড়ানোর উৎসব। প্রত্যেক বছর পূর্ণিমার এ তিঁথিতে রাতে দক্ষিণ উপকূলের পটুয়াখালীর সাগরপারের কলাপাড়ায় আকাশে ভেসে বেড়ায় ফানুসের আলো। যেন তারার মেলা। আর আনন্দে মাতোয়ারা থাকে রাখাইন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে সবাই। অতিথিসহ সজনদের জন্য থাকে হরেক রকম পিঠে-পুলির আয়োজন করা হয়। বিন্নি চালের গুড়ায় বানানো ওই পিঠে খেতে আলাদা স্বাদ, না খেলে বোঝানোর নয়। এ উৎসবে শামিল হয় ভিন্ন ধর্মের মানুষও। যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সম্মিলন ঘটে। তবে আগের সেই জৌলুস নেই। কলাপাড়া উপকূলের অন্তত আড়াই শ’ বছরের এ উৎসবের কলেবর এখন অনেক ছোট, ম্লান হয়ে গেছে। অনুষ্ঠানের আর্থিক যোগানে হাত বাড়াতে হয় সরকারের কাছে। এক সময়ের দাপুটে আদিবাসী এ রাখাইন জনগোষ্ঠী তারপরও উৎসবের এ ছন্দ ধরে রেখেছেন। এ বছরও সরকারিভাবে কলাপাড়ার ২৮ টি রাখাইন পল্লীর সকল বৌদ্ধবিহার কর্তৃপক্ষের অনুষ্ঠানে সহায়তা দেয়া হয়েছে।
সাগরপারের কলাপাড়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনরা আড়াই শ’ বছর ধরে পালন করে আসছে ফানুস উৎসব। এবছরও সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই উৎসব চলে। দিনভর ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় আকাশে ফানুস ওড়ানোর উৎসব। কোন কোন রাখাইন পাড়ায় টানা তিনরাত চলবে এই ফানুস উৎসব। আবার অনেকেই এক রাতের অনুষ্ঠান করছেন। আজ রাতে শেষ হবে ফানুস উৎসব। তবে আগের মতো এখন আর সেই জৌলুস নেই এ উৎসবে। এক সময়ের দাপুটে এ জনগোষ্ঠী বহুবিধ সমস্যা-সংকটের পাশাপাশি জমি-জমা দখলের কারণে এখন পরিণত হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু জাতিতে। বৌদ্ধ মঠগুলো সংষ্কারের অভাবে জীর্ণদশা হয়েছে। তারপরও সাধ্যমতো চলে ফানুস উৎসব। ১৯৬০ সালের শেষের দিকেও প্রত্যেকটি রাখাইন পাড়া থেকে প্রবারণা পূর্ণিমার সময় টানা তিন দিনের এই ফানুস উৎসবে প্রতি সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ১৫০/২০০টি ফানুস ওড়ানো হতো। আকাশ আলোকিত করে ঘন্টার পর ঘন্টা ফানুস তারার মেলার মতো ভেসে বেড়াতো। শুধুমাত্র রাখাইন উপজাতি নয়, এই উৎসবে সমাবেশ ঘটে অন্য ধর্মের হাজারো মানুষের। একসময় (’৬০ সালের দিকে) বৃহত্তর পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইন পাড়া ছিল একশ’ ৬৮টি। আর রাখাইন পরিবার ছিল পাঁচ হাজার একশ’ ৯০ টি। আর বর্তমানে কলাপাড়ায় মোট রাখাইন পাড়া রয়েছে মাত্র ২৭ টি। পরিবার ৩০৬টি। লোক সংখ্যা ১১৬৯ জন। তারপরও ব্যাপক উৎসবের মধ্যে এ বছর রাখাইন বাসীন্দারা গভীর রাত অবধি ফানুস উৎসব করেছেন। তবে আগে টানা তিন রাত চলত ফানুস উৎসব। এবারে অধিকাংশ রাখাইন পল্লীতে এ উৎসব হয়েছে এক রাতের।
কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, সকাল থেকে বৌদ্ধ বিহারে রাখাইন নারীরা উপস্থিত হয়ে পঞ্চশীল, উপসোথ শীল গ্রহণ করেন। সকলের মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা করা হয়েছে। ভিক্ষু সংঘ থেকে ধর্মীয় উপদেশমূলক ধর্মালোচনা করেন আগতরা। সন্ধ্যায় নাচেগানে উৎসবমূখর পরিবেশে ফানুস উড়ানোর আয়োজন করা হয়েছে। এক থেকে তিনদিন এই উৎসব চলবে। এই প্রবারণা উৎসবকে ঘিরে উপজেলার বৌদ্ধবিহারগুলো নতুন সাজে সাজানো হয়েছে। সকাল থেকে প্রত্যেক রাখাইন পাড়ায় নানা রকম বাহারি পিঠে-পুলি তৈরি হয়েছে। করা হয় পায়েস তৈরি।
এ বিহারাধ্যক্ষ জানান, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। যা আশ্বিনী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। এই মাসের পূর্ণিমার তিঁথিতে পালিত হয় এই উৎসব। তিনি বলেন, ‘ প্রবারণা শব্দের পালি আভিধানিক অর্থ নিমন্ত্রণ, আহ্বান, মিনতি, অনুরোধ, নিষেধ, ত্যাগ, শেষ, সমাপ্তি, ভিক্ষুদের বর্ষাবাস পরিসমাপ্তি, বর্ষাবাস ত্যাগ, ত্যাগের কার্য কিংবা শিষ্টাচার, বিধি, তৃপ্তি বা সন্তুষ্টির বিষয়। বোঝায় ক্ষতিপুরণ, প্রায়শ্চিত্ত ও ঋণ পরিশোধ।’
ইন্দ্রবংশ থেরো বিহারাধ্যক্ষ আরো জানান, বর্ষাবাস সমাপনান্তে ভিক্ষুগণ তাঁদের দোষত্রুটি অপর ভিক্ষুগণের কাছে প্রকাশ করেন। এর প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহ্বান জানান; এমনকি অজ্ঞাতসারে কোনো অপরাধ করে থাকলে তার জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করেন-এটাই পলি ভাষায় প্রবারণা পুর্ণিমা। এইদিন বুদ্ধের চুলধাতুর স্মরণে পরম শ্রদ্ধায় কাগুজে ফানুস তৈরি করে ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে চুলামনি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশে আকাশ প্রদীপ হিসেবে ফানুস বাতি উত্তোলন করা হয়। এসময় ধর্মীয় গাঁথা ব মন্ত্র পাঠ করে উৎসর্গ করে খালি পায়ে বৌদ্ধরা ফানুস উড়িয়ে দেন। মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে সাধু-ধ্বনির সুরে সুরে উড়ানো হয় ফানুস।
বেতকাটা রাখাইন পল্লীর বাসীন্দা ‘ধর্ম বিজয় বৌদ্ধা বিহারের’ সভাপতি মংচো বাবু জানান, তারা প্রথম রাতে ২৫টি ফানুস উড়িয়েছেন। তিনি জানালেন, ফানুস সাধারণত ১২-১৩ ধরনের হয়। তবে তাঁরা প্রধানত নয় ধরনের ফাঁনুস এবছর তৈরি করেছেন। এর মধ্যে ম্যোকেচো , ডোও, বেইনসোন, চিনতেন বোয়েন, প্রাইচা, মালা, প্যারাসুট, শোয়ো, লেজ উল্লেখ যোগ্য। সাধারণত ফানুস তৈরি করতে চাইনিজ রঙিন কাগজ, বাঁশ, সুতি কাপড়, ছাতার জাঙ্গা, কেরোসিন, মটিয়া তেল, সুতা, মোম, গুনা এসব প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব জিনিসপত্র সঠিক মানের পাওয়া যায় না। কাগজ অনেক মোটা যা আকাশে বেশি সময় ওড়েনা। নিচে পড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। যে কারণে ঝুঁকি থেকে যায়। তারপরও কলাপাড়ার অধিকাংশ রাখাইন পাড়ায় কম হলেও ২০/৩০টি করে ফানুস প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসবে আকাশে ওড়ানো হয়। মোট কথা সকল রাখাইন পল্লীতে ফানুস উড়ানোর উৎসবকে ঘিরে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে ঘিরে রাখাইন পল্লীগুলোতে নারী-পুরুষ, শিশুরা উৎফুল্ল রয়েছে। অন্য ধর্মের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে চোখে পড়ার মতো।
শত দৈন্য থাকলেও প্রাবরণা পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে ফানুস উৎসবকে কেন্দ্র করে রাখাইন পল্লীতে বিরাজ করে উৎসব মুখর পরিবেশ। নারী-পুরুষ সবাই মিলিত হন এ উৎসবে। নতুন সাজে, নতুন পোষাকে। হয় ধর্মীয় নানান নিয়ম পালন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ জানান, এ বছর প্রবারণা পুর্ণিমা উপলক্ষ্যে কলাপাড়ার ২৮ টি রাখাইন বৌদ্ধবিহারে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছে। তিনিও একটি পল্লীতে গিয়ে ফানুস ওড়ানোর উৎসবে অংশ নেন।









