বাগেরহাটে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। শুধু বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী। এদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন অন্তত ২২ জন ডেঙ্গু রোগী। সব মিলিয়ে ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলাজুড়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৫৫৮ জন। আর শুধু বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ১৭২ জন।
তবে ডেঙ্গু সংক্রমণ যাতে বাড়তে না পারে, এ জন্য জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করছে। মশক নিধন স্প্রে ছিটানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ডেঙ্গু বিস্তার রোধে করণীয় বিষয়ক প্রচারপত্র বিতরণসহ নানা কাজ করছেন তারা। এবার এসব কর্মযজ্ঞে যোগ দিয়েছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক)-এর সহযোগিতায় শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে যাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করছেন এবং সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিতরণ করছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, জলাবদ্ধ স্থান ও মশার বংশবিস্তারের সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করে পরিষ্কার করছেন। পাশাপাশি রাস্তার পাশে থাকা বিভিন্ন ময়লার স্তূপও পরিষ্কার করছেন তারা।
গতকাল মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাগেরহাট যদুনাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি শুরু করেছেন। উদ্বোধনের সময় যদুনাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জিমি মন্ডল, সুজনের সম্পাদক এস কে এম হাসিব, কোডেকের ফোকাল পার্সন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, সমন্বয়কারী রাগীব আহসান, আইডিয়াল ইনস্টিটিউট, শরণখোলার প্রধান নির্বাহী ওসমান গনি, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কার্যনির্বাহী সদস্য আল আমিন সরদার এবং বাংলাদেশ স্কাউটস, বাগেরহাটের কোষাধ্যক্ষ তানজির হোসেনসহ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
দ্বিতীয় দিনের মতো যদুনাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা দশানী ও খারদ্বার এলাকায় এই কর্মসূচি পালন করেছেন।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি অন্যদেরও সচেতন করতে হবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিক মন্ডল বলেন, চারদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। আমাদের সহপাঠীদের মধ্যেও কারও কারও ডেঙ্গু হয়েছে। এজন্য আমরা সবাই মিলে ডেঙ্গু সংক্রমণ প্রতিরোধে কাজ করছি। সবাই মিলে মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি, তাদেরকে বোঝাচ্ছি। সেই সঙ্গে বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, প্লাস্টিক ও কোনো জায়গায় পানি জমে থাকলে পরিষ্কার করছি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, আমরা যখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করছি, তখন ওই বাড়ির লোকজনও আমাদের সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অংশগ্রহণ করেন।
আরেক শিক্ষার্থী আশামনি বলেন, মশায় না কামড়ালে ডেঙ্গু হবে না। আর মশার উৎপত্তিস্থল যদি ধ্বংস করা যায় এবং বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, তাহলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বন্ধ হবে। এই বিষয়গুলোই আমরা সাধারণ মানুষকে বোঝাচ্ছি।
স্থানীয় বাসিন্দা কবিতা রানী নাথ বলেন, শিক্ষার্থীরা বাড়িতে এসে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাদের এই উদ্যোগের ফলে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে আরও সচেতন হয়েছেন তারা।
কোডেকের ফোকাল পার্সন মাহবুবুর রহমান সুজন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। আমরা প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের টি-শার্ট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার জন্য সরঞ্জাম, মাস্ক প্রদান করেছি। বাগেরহাট শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের কাজ এগিয়ে যাবে। সবাই মিলে কাজ করলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
যদুনাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জিমি মন্ডল বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করবে না, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখাও প্রয়োজন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের এমন কার্যক্রম তাদের সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়াবে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাগেরহাট জেলাজুড়ে কাজ চলছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, প্রচারপত্র বিতরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে বাগেরহাটের ভৌগোলিক অবস্থাও মশার উৎপাদনের জন্য ইতিবাচক। তারপরও সবাই মিলে কাজ করতে পারলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।









