পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা সদর সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে হাজিরহাট ও ধনধানিয়া এলাকায় বিগত ২০ থেকে ২৫ বছরের ২ শতাধিক কবর, বসতঘর, সড়ক ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত এলাকার উত্তর পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের দুটি অংশ নদীতে ধসে পড়ায় পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। ফলে কবরস্থান, বসতঘর ও ফসলি জমি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে।
তেঁতুলিয়া নদীর বেড়িবাঁধের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পশ্চিমাঞ্চল) মো. মুখলেছুর রহমান ও পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন। তাঁরা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন। নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসহ স্থানীয়রা প্রতিনিয়ত মানববন্ধন করছেন।
উপজেলা সদরের সঙ্গে নৌপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হাজিরহাট লঞ্চঘাটসহ জামে মসজিদটি হুমকির মধ্যে রয়েছে। হাজিরহাট-বাঁশবাড়িয়া সড়কের প্রধান বেড়িবাঁধ ও নদীতীরবর্তী একাংশ নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার বাসিন্দারা ভাঙনের আতঙ্কে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অন্যত্র ছুটছেন।
বিগত ৫০ বছরের মধ্যে এ রকম ভয়াবহ নদীভাঙন কেউ দেখেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনকবলিত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। তেঁতুলিয়া নদীতে প্রবল স্রোত ও পানির চাপে সড়ক ও বেড়িবাঁধ নদীতে ধসে পড়ছে।
উপকূলীয় জনপদ হিসেবে পরিচিত দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া, দশমিনা ও রণগোপালদী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম নদীভাঙনের কবলে রয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকায় নদীশাসন ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এর কিছুই হয়নি। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নদীতে ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। নদীর ভাঙনে ফসলি জমি, বসতঘর, পারিবারিক কবরস্থান, সড়ক ও বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর আগ্রাসী ভাঙনে হাজিরহাট এলাকার অসহায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। যেকোনো মুহূর্তে শেষ সম্বলটুকু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নদীর ভাঙনের কারণে কবরস্থান থেকে বাবা-দাদার মরদেহ পুনরায় দাফনের জন্য সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে অনেকের চোখে পানি চলে এসেছে। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলছেন। আবার কারও থাকার মতো এক টুকরো জমিও নেই। ফলে এলাকার বাসিন্দারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলছেন।
উপজেলা সদরের হাজিরহাট এলাকায় তেঁতুলিয়া নদীর করাল গ্রাসে অব্যাহত ভাঙন প্রতিরোধ, তীররক্ষা বাঁধ, সড়ক, বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের দাবিতে ভুক্তভোগীরা মানববন্ধন করেছেন। গত বুধবার থেকে হাজিরহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন ভাঙনপ্রবণ এলাকার ধনধানিয়া সড়কে প্রতিনিয়ত মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শুধু জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে নদীর ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। জরুরি ভিত্তিতে টেকসই নদীশাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা প্রয়োজন। তাঁরা আরও বলেন, মঙ্গল ও বুধবার এই দুই দিনে নদীতে পানির চাপ ও তীব্র স্রোতে হাজিরহাটে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। নদীর ভাঙনে জিওব্যাগ, পাকা সড়ক ও ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মানববন্ধনে এলাকাবাসীর সঙ্গে স্থানীয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়।
এদিকে গতকাল শনিবার সকালে তেঁতুলিয়া নদীর প্রবল স্রোতে হাজিরহাট এলাকায় বেড়িবাঁধের দুটি জায়গায় ফাটল দেখা দেয়। উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।









