১৬ জুলাই ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল জয়ের পর আনন্দ মিছিলের ভিডিও করতে গিয়ে নেত্রকোনায় দীপ্ত চৌধুরী (২৩) নামে এক যুবকের বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গভীর রাতে আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠার পর নেত্রকোনার শহীদ মিনার মোড়ে একটি আনন্দ মিছিল বের হয়। সেই মিছিলের ভিডিও ধারণ করার জন্য দীপ্ত একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওঠেন। সেখানে অসাবধানতাবশত একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে এসে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন এবং ওপর থেকে নিচে ছিটকে পড়েন। গুরুতর আহত অবস্থায় বন্ধুরা তাকে দ্রুত নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।পরে পুলিশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে তার মরদেহ হস্তান্তর করে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা এখনও অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা (FIFA)-এর সর্বশেষ র্যাংকিং অনুযায়ী, বিশ্বের ২১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। অথচ মাঠের পারফরম্যান্সে পিছিয়ে থাকলেও দূর লাতিন আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোর জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে অন্ধ উন্মাদনা আর মৃত্যুর মিছিলে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ স্থানটি দখল করে রেখেছে বাংলাদেশ।
চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচগুলোকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ফুটবল-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১২ জনেরই মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে! ফিফা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানাচ্ছে যে, বিশ্বকাপের মূল স্টেডিয়ামগুলোর ভেতরের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকলেও, বাংলাদেশের মাঠের বাইরের এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে মূলত সমর্থকদের মধ্যে উগ্র সংঘর্ষ, বহুতল ভবনে পতাকা ওড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনা এবং খেলা দেখার চরম উত্তেজনার সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে।
২০২৪ সালে জার্নাল অব ইনজুরি অ্যান্ড ভায়োলেন্স রিসার্চ-এ প্রকাশিত ঢাকার বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন ও জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ বিশ্বকাপ চলাকালেও বাংলাদেশে ২৩ জন তরুণ ফুটবল উন্মাদনার জেরে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
খেলাধুলা বিনোদন ও সম্প্রীতির প্রতীক। প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই উগ্রতা বা প্রাণহানির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয় দলের হার কিংবা জিতে তাই সচেতন ভক্ত হিসেবে আমাদের কিছু কাজ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।
প্রিয় দলের জয়ে যা করা যাবে না:
উচ্চঝুঁকি নিয়ে ছাদ বা বিদ্যুতের খুঁটিতে ওঠা: প্রিয় দলের জয়ে উল্লাস করতে গিয়ে কিংবা মিছিলের ছবি ও ভিডিও তুলতে বহুতল ভবনের বিপজ্জনক ছাদ, সানশেড কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছাকাছি যাওয়া যাবে না। অসাবধানতাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা নিচে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
প্রতিপক্ষকে কটূক্তি ও উসকানিমূলক ট্রল: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পাড়া-মহল্লায় প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের খোঁচা দিয়ে বা হেয় করে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। কুমিল্লায় লিওনেল মেসির একটি পেনাল্টি মিস নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করার জেরে একজন অটোরিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যার মতো নির্মম ঘটনাও ঘটেছে।
মাঝরাতে উচ্চশব্দে হর্ন ও আতশবাজি ফোটানো: গভীর রাতে প্রিয় দল জিতলে রাস্তায় নেমে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, অনবরত হর্ন বাজানো কিংবা আতশবাজি ও পটকা ফোটানো থেকে বিরত থাকুন। এতে শিশু, অসুস্থ ও প্রবীণদের মারাত্মক ঘুমের ব্যাঘাত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
বিজয় মিছিল নিয়ে অন্য সমর্থকদের ওপর চড়াও হওয়া: নিজের দলের জয় উদ্যাপন করুন শালীনভাবে। বিজয় মিছিল নিয়ে অন্য দলের সমর্থকদের বাড়ি বা ক্লাবের সামনে গিয়ে উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া যাবে না।
প্রিয় দলের হারে যা করা যাবে না:
চরম হতাশায় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া: খেলা কেবলই বিনোদন, এটি কোনো জীবন-মরণ বা অস্তিত্বের লড়াই নয়। প্রিয় দল হেরে বিদায় নিলে ক্ষোভে বা হতাশায় আত্মহত্যা বা নিজের ক্ষতি করার মতো চরম ও অবোধ সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না।
সহিংসতা ও মারামারিতে লিপ্ত হওয়া: দল হেরে যাওয়ার ক্ষোভ প্রতিপক্ষ সমর্থকদের ওপর ঝাড়া যাবে না। লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র বা ছুরিকাঘাতের মতো প্রাণঘাতী সংঘাতে জড়ানো ফৌজদারি অপরাধ এবং এটি আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উত্তেজনা নেওয়া: যাদের হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, তারা খেলার ফলাফলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে নিজের ওপর মানসিক চাপ বাড়াবেন না। মনে রাখবেন, আপনার পছন্দের দলটি আপনার হারের খবরও হয়তো জানবে না, কিন্তু আপনার কিছু হয়ে গেলে আপনার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়বে।
বিদ্বেষ ছড়ানো: খেলা শেষে মাঠের লড়াই মাঠেই শেষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা বাস্তবে অন্য দলের খেলোয়াড় বা সমর্থকদের প্রতি কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ভৌগোলিকভাবে হাজার মাইল দূরের কোনো দেশের ফুটবল দলকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে ভাবা এবং অন্ধ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণেই এই ট্র্যাজেডিগুলো ঘটছে। খেলাকে খেলার জায়গায় রাখুন। ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা বজায় রেখে পারস্পরিক সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে আমাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে হবে।







