ত্রিশ বছর ধরে বিনা বেতনে কৃত্রিম প্রজনন (এআই) সেবা দিয়ে আসা প্রাণিসম্পদ বিভাগের এআই টেকনিশিয়ানরা এবার ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সরকারি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন। এর ফলে মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম প্রজনন সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে সময়মতো গাভিতে সিমেন প্রয়োগ না হওয়ায় গবাদিপশুর প্রজনন চক্র ব্যাহত, বাছুর উৎপাদন কমে যাওয়া এবং প্রান্তিক খামারিদের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ১১টায় পটুয়াখালী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ এআই টেকনিশিয়ান কল্যাণ সমিতির পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা শাখার নেতাকর্মীরা। কর্মসূচিতে দুই জেলার শতাধিক এআই ও মহিষ এআই টেকনিশিয়ান অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ১৯৯৭ সাল থেকে তারা দেশের গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু দীর্ঘ ৩০ বছরেও তারা কোনো বেতন-ভাতার আওতায় আসেননি। একসময় মাসিক দুই হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হলেও সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
তারা আরও বলেন, এআই কার্যক্রমের মাধ্যমে গত অর্থবছরে সরকার প্রায় ১২ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে। আন্দোলনের মুখে পূর্বে প্রতি উপজেলায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৪৯৫ জনকে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আদালতের স্থগিতাদেশে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরপরও দীর্ঘদিন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ১ জুলাই থেকে সারাদেশের ৫ হাজার ২৭২ জন এআই টেকনিশিয়ান অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। দৈনিক হাজিরাভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে বলেও জানান তারা।
কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ এআই টেকনিশিয়ান কল্যাণ সমিতির পটুয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি মো. আবু কালাম, সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক মো. আরিফুর ইসলাম এবং বরগুনা জেলা শাখার সভাপতি মো. মাহাবুবউল আলম।
এআই টেকনিশিয়ানদের দাবি, কর্মবিরতি দীর্ঘ হলে নির্ধারিত সময়ে গাভিতে সিমেন প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না। এতে অনেক গাভির প্রজনন চক্র নষ্ট হয়ে যাবে, বাছুর উৎপাদন কমবে এবং খামারিদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। বিকল্পভাবে সেবা নিতে হলে অনেককে অতিরিক্ত অর্থও ব্যয় করতে হবে।
তবে জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, পটুয়াখালীর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শুভেন্দু সরকার বলেন, এআই টেকনিশিয়ানদের দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচ্য। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারি সেবা কার্যক্রম সচল রাখতে বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং খামারিদের যাতে ভোগান্তিতে না পড়তে হয়, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।
জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের উপপরিচালক ডা. ইসরাফিল হোসাইন বলেন, কর্মবিরতির কারণে মাঠপর্যায়ে সেবায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন না। এআই টেকনিশিয়ানরা মূলত সেবার মাধ্যমে আয় করেন এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে তাদের কোনো বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না। তাদের দাবি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে। তাঁর দাবি, কর্মবিরতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবে প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, কৃত্রিম প্রজনন সেবা দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে গবাদিপশুর উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে টেকনিশিয়ানদের দাবি নিষ্পত্তি করে মাঠপর্যায়ের সেবা স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।








