
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধিঃ একটি ইনকিউবেটর মেশিনই বদলে দিয়েছে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ইমাম হোসেনের জীবনের গল্প। একসময় সীমিত পরিসরে হাঁস-মুরগি পালন করে সংসার চালাতে হিমশিম খেলেও এখন বাণিজ্যিকভাবে বাচ্চা উৎপাদন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। পরিবারের সচ্ছলতা যেমন ফিরেছে, তেমনি তার সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন গ্রামের অন্য খামারিরাও।
ইমাম হোসেনের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুরিমারা গ্রামে। প্রায় ২১ বছর আগে বিয়ে করার পর কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোট পরিসরে হাঁস, মুরগি ও গবাদিপশু পালন শুরু করেন। প্রথমে হাঁসের বাচ্চা কিনে বড় করে ডিম উৎপাদন ও বিক্রি করতেন। পরে সেই ডিম থেকে মা হাঁসের মাধ্যমে বাচ্চা ফুটাতেন। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে বছরে একটি হাঁস থেকে মাত্র ৫-৬ বার বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়েন।
এ অবস্থায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উন্নয়ন সংস্থা হিড বাংলাদেশ-এর প্রশিক্ষণে ইনকিউবেটর মেশিনে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফোটানোর আধুনিক পদ্ধতি শেখেন। পরে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বিনামূল্যে একটি ইনকিউবেটর মেশিন পান। এরপর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে তার ভাগ্যের চাকা।
বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ২৫০ থেকে ২৮০টি হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করছেন। পাশাপাশি প্রতিদিন ৫০ থেকে ৮০টি ডিম বিক্রি করছেন। ইনকিউবেটরের কারণে মা হাঁস বা মুরগির ডিমে তা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ফলে ডিম উৎপাদনও বাড়ছে এবং একই সঙ্গে বাচ্চা উৎপাদনও অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে।
ইমাম হোসেন জানান, ইনকিউবেটরের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত চারবার সফলভাবে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফুটিয়েছেন। মুরগির ডিম ফুটতে সময় লাগে ২১ দিন এবং হাঁসের ডিমে লাগে ২৮ দিন। তার খামারে মুরগির ডিম থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হাঁসের ডিম থেকে ৬৫-৭০ শতাংশ বাচ্চা ফুটে থাকে। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ১৩০টি হাঁস ও শতাধিক মুরগি রয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশু পালন, পুকুরে মাছ চাষ এবং ফলের বাগানও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আগে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনে অনেক সময় ও শ্রম লাগত। এখন ইনকিউবেটরের কারণে উৎপাদন বেড়েছে, আয়ও বেড়েছে। পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়াও নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারছি।”
ইমাম হোসেনের স্ত্রী কোহিনূর বেগমও খামারের কাজে সমানভাবে সহযোগিতা করছেন। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী, ছোট মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।
তবে একটি সমস্যার কথাও জানিয়েছেন তিনি। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ইনকিউবেটর পরিচালনায় সমস্যা হয়। এজন্য একটি সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) ব্যবস্থা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা তার।
হিড বাংলাদেশের পাখিমারা অফিসের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. ইব্রাহিম খান জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত বিশেষ কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে এ ধরনের ইনকিউবেটর মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে হাঁস-মুরগির বাচ্চার সহজলভ্যতা বাড়ছে, খামারিদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, ইমাম হোসেনের সফলতা প্রমাণ করেছে—আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং পরিশ্রম থাকলে গ্রামেই গড়ে তোলা সম্ভব লাভজনক খামার, আর বদলে দেওয়া সম্ভব একটি পরিবারের অর্থনৈতিক চিত্র।

