গত ১৬ জুন (মঙ্গলবার) ডলফিন পরিবহনের একটি বাস বরিশাল জিরো পয়েন্টের আগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উল্টে পরে।এর আগে গত ৫ জুন পটুয়াখালী-বরিশাল মহাসড়ক অংশে ৪ টি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার খাদে পরে যায়।এতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম যোগাযোগ পথ ভাঙ্গা-কুয়াকাটা অংশের নিয়মিত চিত্র এটি।
পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে পটুয়াখালী ও পর্যটন নগরী কুয়াকাটার অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এই উন্নয়নযাত্রাকে টেকসই করতে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর ও কুয়াকাটার বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা পটুয়াখালীবাসীর জন্য আগে কোনটি বেশি জরুরি? ঢাকা-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, নাকি বহুল প্রতীক্ষিত রেল সংযোগ?
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় ব্যবসায়ী, ও সাধারণ মানুষের মতামতের ওপর ভিত্তি করে উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুটি প্রকল্পেরই গুরুত্ব অপরিসীম, তবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী চাহিদার নিরিখে অগ্রাধিকারে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে পটুয়াখালী ও কুয়াকাটায় সড়কপথে গাড়ির চাপ বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু মহাসড়কটি এখনো দুই লেনের রয়ে যাওয়ায় এটি এখন যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্যমতে, পদ্মা সেতু চালুর পর এই রুটে যানবাহনের সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় ৩০০% বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই লেনের সরু রাস্তায় প্রতিদিন শত শত পর্যটকবাহী বাস, পায়রা বন্দরের পণ্যবাহী ট্রাক এবং স্থানীয় যানবাহন চলাচল করছে। কুয়াকাটায় পর্যটক আগমন বাড়লেও সরু সড়কের কারণে প্রায়ই মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, যা পর্যটকদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে তিক্ত করছে। এছাড়া পায়রা বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য চার লেন সড়ক এখন সময়ের দাবি। চার লেন সড়কের জন্য ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় ভূমি অধিগ্রহণ এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে রেল লাইনের চেয়ে কম সময় এবং তুলনামূলক কম খরচের প্রয়োজন। তাই তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুফল পেতে চার লেন সড়কই পটুয়াখালীবাসীর প্রথম এবং জরুরি চাহিদা।
পটুয়াখালী ও কুয়াকাটাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার জন্য সরকারের মেগা পরিকল্পনা রয়েছে। ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ২১ হাজার কোটি টাকার এই রেললাইন প্রকল্প এই অঞ্চলের অর্থনীতির ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, দেশের আরও ১০ জেলা রেল যোগাযোগের আওতায় আসছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলায় এ সেবা সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে জানান তিনি। জেলাগুলো হলো, শেরপুর, মেহেরপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও লক্ষ্মীপুর। উল্লেখ্য দেশের ৪৯ জেলায় ইতোমধ্যে রেল যোগাযোগ রয়েছে।সরকারের নির্বাচনী ইস্তেহারে ৬৪ জেলায় রেল যোগাযোগ বিস্তারেত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
পায়রা সমুদ্র বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে প্রতিদিন হাজার হাজার টন কার্গো পণ্য পরিবহন করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারী পণ্য পরিবহনে সড়কের চেয়ে রেল যোগাযোগ অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। একটি মালবাহী ট্রেন একবারে যত পণ্য পরিবহন করতে পারে, তার জন্য শত শত ট্রাকের প্রয়োজন হয়, যা সড়কের ওপর চাপ বাড়ায়। কুয়াকাটায় প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন। সড়কপথের ক্লান্তি দূর করে নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য রেল সংযোগ হবে গেম-চেঞ্জার। রেললাইন প্রকল্পের জন্য বিশাল ভূমি অধিগ্রহণ, বড় বড় নদীগুলোর ওপর রেল সেতু নির্মাণ এবং বিশাল বাজেটের প্রয়োজন। ফলে এই প্রকল্প সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় (কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ বছর) লাগবে। উল্লেখ্য, ৮ বছর আগে ভাঙ্গা-কুয়াকাটা রেল প্রকল্প এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
পটুয়াখালীর অর্থনীতি এখন দ্রুত বিকাশমান। এই মুহূর্তে যদি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না করা হয়, তবে পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটার সম্ভাবনা থমকে যেতে পারে। সড়কপথ সচল না থাকলে বর্তমানের তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনা থামানো যাবে না। কুয়াকাটার বর্তমান পর্যটন শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং পায়রা বন্দরের প্রাথমিক পণ্য পরিবহনের জন্য চার লেন সড়ক আগামী দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব।
অন্যদিকে পায়রা বন্দর যখন পূর্ণ সক্ষমতায় চলবে এবং কুয়াকাটা যখন আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে, তখন শুধু সড়কপথ দিয়ে এই চাপ সামলানো অসম্ভব হবে। তাই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য রেল সংযোগের কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়া দরকার।







