মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: বিধবা, অশীতিপর এই বৃদ্ধা এখন কোথায় যাবেন। পুরো নাম মোসাম্মৎ ফাতেমা বেগম। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছেন। বসলে উঠতে পারেন না। উঠলে বসতে পারেন না। অন্যের সহায়তা নিতে হয়। ৯২ বছর বয়সী এই অসহায় মানুষটিকে ১৭দিন আগে এক রাতে বসতঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একমাত্র ছেলে ইব্রাহীম ও নাতি ইমরান, সুমাইয়াসহ কয়েকজনে তাড়িয়ে দেয় বলে বৃদ্ধার অভিযোগ। সে এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে মহিপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এখানেই শেষ নয়। এর আগে এ বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময় ডাক্তার দেখানোর কথা বলে নাতি ইমরাণসহ তার সহযোগিরা কলাপাড়া পৌরশহরের একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে রাখে। সেখানে আটকে চিকিৎসার টাকা দেওয়া হবে। ওই টাকা ব্যাংকে তার একাউন্টে জমা রাখা হবে-এমনসব বলে সহায়-সম্বল বলতে ১৩ শতক জমি হেবা দলিল করে নেয়া হয়। নাতি ইমরান নিজের নামে এ দলিল সম্পাদন করে নেয়। অসহায় এই বিধবা বৃদ্ধার বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নের চরচাপলী গ্রামে। এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মা। ৯৪ সালে স্বামী আব্দুল লতীফ মারা গেছেন। তারপরও একমাত্র ছেলের সংসারে পরেছিলেন। সংসারের কাজকর্ম সাধ্যমতো করতেন। হাঁসমুরগি পালন করতেন। একটা পুকুর ছিল। ছিল কয় শতক চাষের জমি। তবে নিগ্রহ চলত তার ওপর। এখন মানুষটি দুচোখে সব অন্ধকার দেখছেন। জানালেন আজ সকালে মুড়ি আর চিনি খেয়েছেন। ভাত ঠিকমতো জোটে না। অসহায়ত্ব যেন জাপটে ধরেছে।
ফাতেমা জানান, তার ভাইয়ের ছেলে রহিমও এ কাজে জড়িত ছিল। পাঁচ মেয়ের একজন খাদিজা বেগম জানতে পেরে ৯৯৯ কল করে পুলিশের সহায়তায় হোটেল থেকে মায়ের খোঁজ পায়। কিন্তু দলিল ঠিকই করে নেওয়া হয়। দলিলে চার শতক নাল জমি ৯০ হাজার ও ৯ শতক পুকুর ১১ লাখ ৬০ হাজার মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার মূল্য দেখানো হয়েছে। দলিলটি সম্পন্ন করা হয় ২২ মে-২০২৫। যার নম্বর ২২৮১। কিন্তু জীবনের যে কয়দিন বাঁচবেন একয় দিনের চিকিৎসা খরচ তো দূরের কথা কোন ধরনের টাকাপয়সা না দিয়ে বৃদ্ধা মানুষটির ওপর চরম অমানবিকতা চালানো হয়। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়। গালমন্দ করা হয়, এমনকি শারীরিকভাবেও হেনস্থা করা হয়। এসব বলে চোখের পানি ছেড়ে দেন বয়োবৃদ্ধা ফাতেমা বেগম। এক পর্যায়ে ১৭দিন আগের এক রাতে ঘরবাড়ি থেকে পাষন্ড ছেলে ও নাতিরা বেড় করে দেয়। রাতের বেলা একই উঠোনের পাশে মেয়ে খাদিজা বেগমের ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেড়ার উপরে পড়ে গেলে মেয়ে খাদিজার ঘরের এক নাতি তাঁকে (নানিকে) ঘরে তুলে নেন। খাদিজার সংসারেও অভাব অনটন রয়েছে। এখন আর চলতে পারেন না। বৃদ্ধা মাকে নিয়ে এমনসব অমানবিক বর্বরতার বিচার চেয়ে ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে।
আজ রবিবার দুপুর বেলা অনেক কষ্টে কলাপাড়া প্রেসক্লাবের তিন তলায় গিয়ে এসব বলে ঘন্টাব্যাপী কান্না জড়ানো কন্ঠে বৃদ্ধা এই মানুষটি তার আশ্রয়স্থল ও ভরণ-পোষণের কী কবে এমন আকুতি জানিয়ে কান্না জুড়ে দেন। মেয়ে খাদিজা জানান, তার মাকে ভুল বুঝিয়ে তার জমিটুকু হাতিয়ে নিয়ে বসতঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি এর আইনি প্রতিকার চেয়েছেন।
অভিযুক্ত ছেলে ইব্রাহিম হাওলাদার জানান, তার বোন খাদিজা বেগম ষড়যন্ত্র করে তার মাকে তাঁদের ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন তিনি তার মায়ের চিকিৎসার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন। ভরণপোষণে ধারদেনায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এ কারণে তার মা ফাতেমা বেগম নিজে স্বেচ্ছায় ওই জমির দলিল দিয়েছেন। তিনি যদি দোষী থাকেন তাইলে যে কোন বিচার মাথা পেতে নিবেন বলেও মন্তব্য করেন ইব্রাহিম হাওলাদার। তিনিও এর সুষ্ঠু তন্ত দাবি করেন। ইব্রাহিম এও বলেন খাদিজা নিজেও কিছু জমি দলিল করে নিয়েছে।
মহিপুর থানার এসআই লিটন জানান, ওই বৃদ্ধা মহিলার আবেদনটি তার ওপর হাওলা করা আছে। তিনি আজকে (রবিবার) সন্ধ্যার পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিবেন। তবে এলাকার কিছু সচেতন লোকজন দাবি করেছেন যে, দুই ভাইবোনের দ্বন্ধে এই বৃদ্ধা মহিলা চরম বিপাকে পড়েছেন।









