মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার নৈসর্গিক লীলাভূমি পর্যটনকেন্দ্র সাগরকন্যা কুয়াকাটা পৌর এলাকায় হোটেল-মোটেলসহ সকল স্থাপনা নির্মাণ চলছে ফ্রি-স্টাইলে। সরকারি বিধিবিধান মানার বালাই নেই। যে যার মতো করে স্থাপনা নির্মাণ করছেন। শতকরা ৯০ ভাগ ভবনসহ অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি বিধি, পরিবেশ আইন ও মাস্টারপ্ল্যানের নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম কোন কিছুই মানা হয় না। পৌর এলাকায় দেড় শতাধিক আবাসিক হোটেল-মোটেল সচল রয়েছে।
নির্মানাধীনসহ এর সংখ্যা প্রায় ২৫০টি। পরিকল্পিত উন্নয়ন জোরদার করতে নিয়ম শৃঙ্খলা না থাকায় এখানে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত শহর। যেখানে মানা হয় না জোনিং আইন। যা পর্যটনকেন্দ্রের টেকসই উন্নয়নের অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় গোটা শহরটি একটি ‘কংক্রিটের জঙ্গলে’ পরিণত হতে যাচ্ছে। এমনকি সাগরের ওয়াটার লেভেল দখল করেও তোলা হয়েছে ঝুকিপূর্ণ স্থাপনা। যা আধুনিক কুয়াকাটা গড়তে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার শঙ্কা তৈরি করছে।
পর্যটন এলাকায় সরকারি বিধিমতে, নির্দিষ্ট জোন মেনে যে কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পরিকল্পনার বাইরে কিংবা অনুমতি ছাড়া কোন ধরনের নির্মাণ নিষিদ্ধ রয়েছে। ভবনের উচ্চতা, ঘনত্ব ও ভূমি ব্যবহারে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে খুশি হোটেল বানানো যাবে না। জোনিং আইন মানতেই হবে।
এরপরে স্থানীয় পৌরসভা, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের আনুমোদন ব্যতীত কোন স্থাপনা নির্মাণ করার সুযোগ নেই। যা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। কিন্তু এ সবের তোয়াক্কা কেউ করছেন না। আর কুয়াকাটা পৌর কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে গত এক যুগে কার্যকর তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে থামছে না অপরিকল্পিত নির্মাণ ও উন্নয়ন।
এছাড়া কুয়াকাটায় পর্যটন এরিয়ায় স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক থাকার কথা রয়েছে। সমুদ্র সৈকতের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে স্থায়ী নির্মাণে সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। বন, ইকোপার্কসহ সংরক্ষিত এলাকার পাশে নির্মাণে রয়েছে কঠোর বিধি নিষেধ। এসব না মানার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ব্যত্যয় ঘটছে বিল্ডিং কোড ও উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ মানা হচ্ছে না।
উচ্চতা সীমা নির্ধারিত, সেফটি, ফাউন্ডেশন, ভূমিকম্প সহনশীলতা বাধ্যতামূলক করার কথা। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় এই পর্যটন এলাকা থাকায় অতিরিক্ত প্রকৌশল মানদন্ড মানার নিয়ম রয়েছে। ফলে এসব স্থাপনা পরিকল্পনা বহির্ভূত থাকায় ভেঙে ফেলার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। এক কথায় মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী অনুমতিছাড়া নির্মিত এসব স্থাপনা নির্মাণ সরাসরি আইনভঙ্গের শামিল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন কলাপাড়ার আহ্বায়ক সংগঠক নজরুল ইসলাম বলেন, যেহেতু কুয়াকাটা একটি কোস্টাল ইকো সেনসিটিভ জোন সেই কারণে প্রথমত জমি খাস, সংরক্ষিত বন বা ইকো সেন্সিটিভ জোন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থাপনা হোটেল-মোটেল রিসোর্ট স্থাপন করতে গেলে প্রথমেই ভবনের নকশা, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, পার্কিং, ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ প্ল্যান স্পষ্ট করা বাধ্যতামূলক রয়েছে। বড় প্রকল্প হলে ইআইএ, বর্জ্র ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, এমনকি শব্দ ও পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা সঠিকভাবে মানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রয়োজনে প্রকল্পটি পর্যটনবান্ধব কিনা, আন্তর্জাতিক মান বজায় হচ্ছে কিনা এটিও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। লগ্নিকারকদের মনে করতে হবে কুয়াকাটায় হোটেল নির্মাণ মানে শুধু বিল্ডিং না। এটি জমি আইন, পরিবেশ আইন, পর্যটন নীতি ও মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে সবকিছুর সমন্বয় থাকতে হবে।
নজরুল ইসলাম আরো বলেন, এমনিতেই প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে সৈকতের প্রায় আড়াই কিলোমিটার প্রস্থ সবুজ ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলসহ দৃষ্টি নন্দন ইকোপার্ক, জেলেপল্লী সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। এখন মূল শহরের অবকাঠামো পরিকল্পনামাফিক করা প্রয়োজন জরুরি।
কলাপাড়ার উন্নয়ন সংগঠক স্থপতি ইয়াকুব খান বলেন, পর্যটন এরিয়ায়কে পরিকল্পিত ভাবে সাজাতে ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান জনসম্মুখে প্রকাশ করে তা বাস্তবায়নে নকশা অনুমোদনের পূর্বে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণে কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি সৌন্দর্য রক্ষা হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক দুর্ঘটনার জন্য অনুমোদিত নকশাকে সঠিকভাবে ফলো না করাও দায়ী থাকে। অবশ্য এ সকল বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির বিকল্প নাই।
শিক্ষক ও সমাজ উন্নয়ন সংগঠক মো. সাঈদুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বিল্ডিং কোড না মেনে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ বর্তমানে দেশের নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। কুয়াকাটা এর বাইরে নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরমুখী মানুষের চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
এতে একদিকে যেমন নগরের সৌন্দর্য ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষ করে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্যান্য দুর্যোগের সময় এসব অনিরাপদ ভবন বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। দেশ বিদেশি পর্যটকদের মনকর্ষণ হয় এমন কিছু করার তাগাদা দিলে ভালো হয়।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি মোতালেব শরীফ মনে করেন, মূলত ‘কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন জরুরি। এটি না হওয়ায় ব্যবসায়ী তথা লগ্নিকারকরা; যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্রুত প্রসারতায় ভবন নির্মাণ করছেন তারা অনেকেই হতাশ হয়ে আছেন। সকলের অভিযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে অনুমোদন পাওয়া জটিল।
এ কারণে সবকিছু ঠিকঠাক মানা যায় না। ফলে মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই নির্মাণ হচ্ছে বহু স্থাপনা। আগে বানাও পরে দেখবো-এমন মানসিকতা নিয়েই চলছে কুয়াকাটায় স্থাপনা নির্মাণ। স্থানীয় পৌর প্রশাসনেরও গড়িমসি রয়েছে বলে জনাব শরীফ দাবি করেন। পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগকে এক্ষেত্রে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পাওে বলে তার মতামত। জেলা প্রশাসন থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে দৌড়াদৌড়ি করে উদ্যোক্তারা হয়রাণ হয়ে পড়ছেন। বাধ্য হয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বালু ভরাট করে যুগ যুগ ধরে চলছে স্থাপনা নির্মাণ।
স্থানীয় এক বাসীন্দার অভিযোগ, এখানে সুউচ্চু বহুতল ভবন নির্মাণে শ্রমিকসহ পথচারীদের নিরাপত্তা পর্যন্ত মানা হয় না। নিরাপত্তা না মানায় নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। কিন্তু নিয়মের মধ্যে আসছেন না ভবন মালিকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক নাগরিক বললেন, হোটেল রূপান্তি নির্মণকালে ভবন থেকে পড়ে শ্রমিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এভাবে বহুতল হোটেলের নির্মাণ কাজ চলছে সেফটি ছাড়া।
কুয়াকাটা পৌরপ্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেকের দেওয়া তথ্যানুসারে, কুয়াকাটা পৌরসভায় মোট ৩০৭৪ টি হোল্ডিং রয়েছে। এর মধ্যে খাবার হোটেল, আবাসিক হোটেল নিয়ে মোট ২৬৬ টি বাণিজ্যক হোল্ডিং রয়েছে। যার মধ্যে মাত্র ৩৮টি হোল্ডিং মালিক স্থাপনা তোলার জন্য কুয়াকাটা পৌরসভা থেকে অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করেছেন। বাকিসব স্থাপনার কোন ধরনের নির্মাণ বৈধতা নেই।
এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে এখানে নিয়ম না মানার শহরে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে একদিকে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ভোগান্তি হচ্ছে পর্যটক দর্শনার্থীর। অপরদিকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
কুয়াকাটা সী-বিচ ম্যাজেমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, শীঘ্রই সরেজমিন পরিদর্শন করে বৈধ-অবৈধ যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা বিভাগীয় সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হবে।
২০১০ সালের আগে লতাচাপলী ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রিত ছিল কুয়াকাটা সৈকতসহ পর্যটন এলাকা। পরে লতাচাপলী মৌজার ১১৪০ দশমিক ৫৫ একর এরিয়া নিয়ে কুয়াকাটা পৌরশহরে উন্নীত করা হয়। তখন সরকারিভাবে ২৮৪ একর খাস জমি চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তিতে সীমানা কিছুটা বর্ধিত করা হয়েছে। এতোবছর পরও অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ হয়নি। যা পরিকল্পিত নগর গঠনে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে।









