মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: প্রতিবন্ধী কিশোর বয়সী রাজু তার বিধবা মা ফাতেমা বেগম ও হাফেজি পড়ুয়া ছোট বোনের জীবিকার যোগান দেওয়ার অবলম্বন সাতটি দোলনা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছে। মায়ের হাতের তৈরি এই দোলনায় গঙ্গামতি সৈকতে আসা পর্যটককে বিনোদন দিত। যে যা দিতেন তাই দিয়ে তাঁদের সংসারের ভরণ-পোষণ চলছিল। দোলনা পোড়ানোর বিষয়টি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার গঙ্গামতি সৈকতের খবর।
সৈকতের বেলাভূমে ঝাউ গাছের সঙ্গে ঝোলানো দোলনায় পর্যটকরা দুললে জীবিকার যোগান জুটতো প্রতিবন্ধী রাজুর পরিবারের। কোনদিন এক টাকাও জুটত না। আবার কোনদিন পাঁচ শ’ টাকাও পেত। ওখানকার টুরিস্টদের ব্যবহৃত একটি ওয়াশরুমও পরিষ্কার করত রাজু। এই আয় দিয়ে প্রায় তিনটি বছর রাজুর সংসারের যোগান চলছিল। চলছিল ছোট্ট বোনের লেখাপড়া। পর্যটকরা আসলে যদি কেউ দোলনায় ঝুলত তাইলে কমবেশি আয় হতো রাজুর সংসারে। প্রকৃতির দেওয়া নৈসর্গিক দৃশ্য পর্যটককে দেখার সুযোগের মধ্য দিয়ে জীবিকার উপায় খুঁজে পেয়েছিল প্রতিবন্ধী ওই কিশোর, রাজু। কারো কাছে হাত পাতেনি। কিন্তু গতকাল রাজুৃর জীবিকার অবলম্বন সাতটি রশির বানানো সেট করা দোলনা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম এই সর্বনাশ করেছে বলে রাজু মা ফাতেমা বেগম জানালেন। এখন এ পরিবারের সবাই দুচোখে সর্ষেফুল দেখছেন। স্থানীয়রাও বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
রাজু’র মা ফাতেমা বেগম জানান, প্রায় এক মাস আগে জাহিদের নেতৃত্বে ১১টি ছাতাসহ বেঞ্চিপাতা হয় ওই সৈকতে। কিন্তু পর্যটকরা বেঞ্চিতে না বসে কেন দোলনায় উঠেছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা উঠছে। দুলছে। দেখছেন সাগর। এছাড়া বেঞ্চিতে বসলে ৩০ টাকা দিতে হয় জনপ্রতি। আর রাজুর দোলনায় নির্দিষ্ট কোন রেট নাই। যে যা খুশিমনে দেয় তাতেই স্বস্তি। এটিও রাজুর অপরাধ। এ কারণে ক্ষীপ্ত হয়ে এমন অমানবিকতা চালানো হয়েছে প্রতিবন্ধী রাজুর উপর। জীবিকার উপায় হারিয়ে এই অসহায় পরিবারটি এখন দিশেহারা হয়ে আছেন।
রাজুর দোলনা পোড়ানোর একটি ভিডিও আজ, সোমবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেখানে মানুষ বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করছেন। বর্তমানে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া প্রকৃতি নির্ভর উপার্জন সচল রাখতে সকলের প্রতি আকুলতা জানিয়েছেন রাজুর মা ফাতেমা বেগম। প্রায় তিন বছর আগে অর্থাভাবে রাজুর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। চতৃর্থ শ্রেণিতে পড়ছিল। এরপরে ক্ষ্যান্ত হয়ে গেছে। প্রতিবন্ধী হয়েও রশি কিনে মায়ের হাতের বোনা ওই সাতটি দোলনা ছিল জীবিকার অবলম্বন। তাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবারটি এখন নির্বাক হয়ে আছেন। তারা নতুন করে দোলনার যোগান ও গঙ্গামতি সৈকতে ফের স্থাপন করার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
অভিযুক্ত ধুলাসার ইউনিয়ন ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, তিনি এর জন্য দায়ী নন। বিষয়টি আসলেই দুঃখজনক। তাঁদের ছাতাবেঞ্চি দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত আলিফ নামের সমবয়সী একটি ছেলে রাজুর দোলনা পুড়েছে। তিনি এজন্য আলিফকে কাজ থেকে বাদ দিয়েছেন। গালমন্দ করেছেন। রাজুর ক্ষতিপুরণসহ দোলনা বানানোর ব্যবস্থা নিজ থেকে ব্যবস্থা করেছেন। রাজুর আয়ের জন্য সকল ব্যবস্থা তিনি করছেন বলে জানান।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, তিনি বিষয়টি দেখবেন।









