কলাপাড়া প্রতিনিধি: ঈদের একদিন পরে সোমবারে স্বপরিবারে কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছিলেন আশরাফুল হক। মধ্যবয়সী এই মানুষটি পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে টিনের ছাপড়া দেওয়া একটি হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়েছেন।
জানালেন, তার কাছে খাবারের দাম অনেক বেশি নেওয়া হয়েছে। বিবরণ দিয়ে বললেন, ‘চারটি ছোট সাইজের (সর্বোচ্চ দেড় ইঞ্চি) টেংরা মাছের দাম রাখা হয়েছে দেড় শ’ টাকা। শুটকির একটুখানি ভর্তা দেড় শ’ টাকা, আর চারটি ছোট সাইজের চিংড়ি (স্থানীয় ভাষায় হরিণা) দুই শ’ টাকা।’ একেকজনের ৫৫০ টাকা। ভাতের দাম নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। মানুষটির অভিব্যক্তি ছিল হতাশজনক। তার ভাষায়, ‘এটি প্রতারণার পর্যায়ে বলা চলে।’
এমন এন্তার অভিযোগ খাবার হোটেল-রেস্তরার বিরুদ্ধে। গলাকাটা ব্যবসা করা হয় পর্যটকের ভিড় দেখলেই। হোটেলগুলোতে নেই কোন খাবারের রেটচার্ট। আর নোংরা আবর্জনা তো থাকছেই। কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকের ওপর এমন নৈরাজ্য যেন থামছেই না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে প্রকৃতির দান কুয়াকাটার সৈকতকে ঘিরে গড়ে ওঠা গোটা ব্যবসা-বাণিজ্য একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট তাঁদের টাকা আয়ের পথকে ঠিক রাখতে নিয়ন্ত্রণ করছেন। পর্যটকের স্বস্তির বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষা করছেন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে মূলত দায়ী করছেন পর্যটকসহ ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা।
গত প্রায় দেড় যুগ থেকে এই ধারা থেকে কেউ সামগ্রিক উন্নয়নের চিন্তা করতে পারছেন না। বর্তমানে এমন অব্যবস্থাপনা বন্ধে ট্যুরিস্ট পুলিশে ভুমিকা খুবই উদ্বেগজনক। নেই তাঁদের দৃশ্যমান কোন কার্যক্রম। গত দেড় বছরেও এরা একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন বলে পর্যটকের অভিযোগ। যার কারণে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কুয়াকাটার থেকে। তবে ট্যুরিজম বোর্ড বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি স্থানীয় ইয়াং সংগঠকরা শৃঙ্খলা ফেরাতে গত কয়েকদিন ধরে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সৈকতের শুন্যপয়েন্টর পশ্চিম দিকের ছাতা-বেঞ্চিতে বসেছিলেন শিহাব উদ্দিন। স্বপরিবারের আসা এই মানুষটি যতক্ষণ সৈকতে ছিলেন ততক্ষণই তার দুই বছর প্লাস বয়সী নাতিকে নিয়ে টেনশনে থাকতে হয়েছে। এক ঘন্টায় তিনি অন্তত ৩০ বার একমাত্র নাতিকে মোটরবাইকের চলন্ত গতির সামনে থেকে আগলে রাখার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ছাতা থেকে সাগরের ওয়াটার লেভেলে দৌড়ে যাওয়া চেষ্টা নাতির। তখনই কোন না কোন মোটরবাইক দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে। বিকট শব্দে হর্ণ দিচ্ছে। ছোট শিশুটা কখনো চিৎকার করে দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটেছে। কখনো ভয়ে কান্না করছিল। এমন অসংখ্য পরিবারকে নির্মল আনন্দের চেয়ে উৎকন্ঠায় থাকতে হয়েছে বেশি। বাইকারদের আচরণ ছিল উত্তক্তকারীদের মতো।
শুন্য পয়েন্টের পূর্ব দিকে ঝোলানো দোলনাগুলোর ভাড়া নিয়ে তো চলছে সমালোচনার ঝড়। এখানে ১০মিনিটের বিনোদনে ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। একই অবস্থা কুয়াকাটা সৈকতের আশপাশের ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে যাওয়া-আসার যানবাহনের ভাড়া বেশি নেওয়ার ভোগান্তি। কোন কিছুতেই শৃঙ্খলা নেই।
পর্যটকরা বলেছেন এখানে সবাই একটা ধান্ধায় ব্যস্ত, টাকা কামাইয়ের। হোক সেটা যে কোন উপায়ে। এমনসব নৈরাজ্যে কুয়াকাটায় আসা পর্যটকরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। প্রচন্ড ক্ষুব্দ মনোভাব পোষণ করেন। বিচের প্লাস্টিক পলিথিনের বর্জ্য অপসারণে দুই বেলা পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজ করছেন। কিন্তু তাতে সংকুলান হচ্ছে না। তবে এখানে আবার ক্ষুদে দোকানির পাশাপাশি পর্যটকেরও অসচেতনতা রয়েছে। তবে সব মিলে অব্যবস্থাপনা বেশি।
পর্যটকরা জানান, কুয়াকাটার সৌন্দর্য মানুষকে বিমুগ্ধ করে, তাই বার বার ছুটে আসেন। কিন্তু এখানকার অধিকাংশ ছোট-বড় ব্যসাযীর পর্যটকের ন্যুনতম সেবা দেওয়ার মানসিকতা নেই। কুয়াকাটা শুন্যপয়েন্টের দুইদিকে অন্তত দেড় শ’ মিটার এলাকায় জোয়ারের সময় পর্যটকরা গোসলে মত্ত থাকেন। আমুদে সময় কাটান এখানে। জোয়ারের ঢেউয়ের সঙ্গে মাতামাতিতে মত্ত থাকেন। কিন্তু পশ্চিম দিকটায় সরদার মার্কেটঘেষা এলাকায় কংক্রিটের অসংখ্য ভগ্নাংশ পড়ে আছে। যা ভয়াবহ দুর্ঘটনার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেয়ারের সময় ঢেউয়ে ও ঘুর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়। সেখানে পর্যটকের আহত হয়ে ডুবে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে।
এমনকি এক বছর আগে ওই স্পটে ডুবে এক পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনার ঘটেছে। নিহত পর্যটকের নাম মিয়া সামাদ সিদ্দিকী ওরফে পারভেজ (১৭)। তার বাড়ি মাগুরা জেলার হাজীপুর পশ্চিম বাড়িয়াল এলাকায়। পর্যটকের পরামর্শ, হয়তো ওই স্পটের কংক্রিটের ভগ্নাংশ অপসারণ করা হোক। নয়তো ওখানে গোসল করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হোক।
কুয়াকাটা চৌরাস্তার পশ্চিম দিকটার বেড়িবাঁধের পুরো স্লোপটি দখল করে ছোট ছোট অস্থায়ী, মৌসুমি দোকানপাটে সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে রাস্তায় দাড়িয়ে সমুদ্রের নৈসর্গিক দৃশ অবলোকন করা যায় না। সৈকতে ওঠানামার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। করা হয়েছে সৌন্দর্যহানি। চৌরাস্তাসহ আশপাশে অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকছে। এসব সমস্যা এখন নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।
যদিও কুয়াকাটা পৌরসভার উদ্যোগে সৈকতে মোটরবাইকারদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। আবারো ছাতা-বেঞ্চি বসানো এলাকা ও গোসল পয়েন্টে কোন ধরনের বাইকারদের বিচরণ বন্ধে সাইনবোর্ড লটকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী পলিথিন-প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ করছেন।
কুয়াকাটা পৌরপ্রশাসক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইয়াসীন সাদেক বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু বেশিদিন নিয়ন্ত্রিত থাকছে না। কয়েকদিন পরে আর ফলোআপ মনিটরিং থাকে না। ছোটখাটো এমন সমস্যা আর অনিয়ম এখন পর্যটকের ভোগান্তির কারণে পরিণত হয়েছে। এটি থেকে বের হওয়া প্রয়োজন।
কুয়াকাটার সামগ্রিক শৃঙ্খল পরিবেশ রক্ষায় এবং পর্যটক বান্ধব করতে কয়েকবছর ধরে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন পর্যটন উদ্যোক্তা, সংগঠক ও গণমাধ্যম কর্মী রুমান ইমতিয়াজ তুষার।
তিনি জানান, রাজনৈতিক নেতৃত্বের যথাযথ সহযোগিতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। তবে তাঁরা সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় টুরিস্ট পুলিশ, পৌরসভার সহায়তায় গত কিছুদিন ধরে একটা শৃঙ্খলায় আনার পথে হাটছেন বলে জানালেন এই উদ্যোক্তা।









