মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: রাবনাবাদ মোহনাসহ বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শত শত চর জেগে ওঠেছে। হাজার হাজার একর এরিয়া নিয়ে মাইলের পরম মাইল চর জেগে ওঠার কারণে উপকূলের সমুদ্রপথ মাছ ধরার ট্রলারসহ নৌ চলাচল চরম ঝুকির কবলে পড়েছে। গভীর সমুদ্রের কোথাও নির্বিঘ্নে কোন ধরণের নৌযান চলাচল করতে পারে না। বিশেষ করে ভাটার সময় স্পিডবোট পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চালানো যায় না।
২০০৮ সালে কুয়াকাটা এবং তৎসংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কাজ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা জিও কাইনেটিক্স সুষ্ঠুভাবে তাদের অনুসন্ধান কাজ পরিচালিত করতে পারেনি। এমনকি পূর্ব পরিকল্পিত ম্যাপ থেকে একটি সাইসমিক লাইন বাদ দিতে হয়েছে। যা পরবর্তিতে স্থানান্তর করে নতুন সাইসমিক লাইনে সম্পন্ন করতে হয়।
ওই কোম্পানির পাবলিক রিলেশন অফিসার অনুজ চৌধুরী বাবু জানিয়েছিলেন, কূল থেকে প্রায় ১৫/১৬-২৫ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। যে কারণে তাদের স্পিডবোট পর্যন্ত চলাচলে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তিনি এমন ধারণা দেন যে কুয়াকাটা সৈকতের পশ্চিম থেকে শুরু করে ১৫-২০কিলোমিটার গভীর সমুদ্র পর্যন্ত পূর্ব দিকের প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর।
জোয়ারের সময় হাটু কিংবা কোমর সমান পানিতে ডুবে থাকে কোন কোন চরগু। কিন্তু ভাটায় পুরো ল্যান্ড এলাকা জেগে ওঠে। জেলেরা পায়ে হেটে চলাচল করছে। এছাড়া সাগর মোহনা আন্ধার মানিক ও ঢোস এলাকা দিয়ে সাগরে যাওয়া এবং আসা পর্যন্ত হমকি মুখে রয়েছে। মোহনায় ডুবো চরের কারণে নৌযান চলাচল করতে গিয়ে আটকে যায়। ফলে দীর্ঘ সাগরবক্ষে এখন নৌ চলাচল হুমকিতে পড়েছে।
২০০৭ সারেল সিডর এবং ২০০৮ সালের আইলার পরে সাগরে জেগে ওঠা চরের সংখ্যা বাড়তে থাকে বলে জেলেরা মন্তব্য করেছেন। তবে ২০২১ সালে পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিট্যাল ড্রেজিংয়ের বালু চ্যানেলের দুইদিকে সাগর নদীতে ফেলায় দ্রুত চর জেগে উঠেছে। চান্দুপাড়া গ্রামের জেলে হাসান মিয়া জানান, আগে রাবনাবাদ চ্যানেল দিয়ে আমরা স্বাচ্ছন্দে, নিরাপদে ডানে কুয়াকাটার দিকে যেতে পারতাম। এখন ডান দিকটায় হাইরের চরের (চরবিজয়) উত্তর দিকটায় বিশাল চর জেগেছে। ফলে হাইরের চরের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে অন্তত ১০-১৫ কিলোমিটার সাগরপথ বেশি ঘুরে কুয়াকাটার দিকে যেতে হয়।
এছাড়া তুফাইন্যার চরের পাশের ‘গ্যাপের চরটিও’ এখন কয়েক বছরের মধ্যে ৭-৮ কিলোমিটার লম্বা হয়ে জেগে উঠেছে। আধা কিলোমিটার প্রস্থ এই চরটি ড্রেজিংয়ের পরে দ্রুত জেগে ওঠে।
একইভাবে ‘বলন্ত চরটিও’ ক্রমশ জেগে উঠেছে। এভাবে সাগরে প্রবেশের তিন-চারটি পথের মাত্র একটি কোনভাবে সচল আছে। বোট নিয়ে এখন সাগরে ঢুকতে সমস্যা হয়। আবার ঝড়ের সময় দ্রুত কিনারে আসতে গিয়ে চরের সঙ্গে বোটের তলা আটকে ডুবির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে চরের কারণে কলাপাড়া-রাঙ্গাবালীর আশাপাশে ইলিশসহ কোন মাছ ধরা চরম বিপজ্জনক। বিশেষ করে পায়রা বন্দরের চ্যানেলের আশপাশে দ্রুতভাবে চর জেগে উঠেছে।
এই জেলের দাবি, আগে রাবনাবাদ থেকে তারা চার-পাঁচটি পথে সাগরে ট্রলার নিয়ে যাওয়া আসা করতেন। এখন মাত্র পথ রয়েছে একটি। বাকিসব চর জেগেছে। আর মাছও কমে গেছে। ইলিশের চলাচলের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
কুয়াকাটার উপকূলীয় জেলে সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, কুয়াকাটা সৈকত থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার সাগর গভীরে অসংখ্য বিরাট বিরাট চর জেগে উঠেছে। যেখানে জোয়ারে ৭/৮ ফুট পানি থাকলেও ভাটার সময় মাত্র ৩/৪ফুট থাকে। ট্রলার চালাতে হয় ধীরে ধীরে।
তিনি জানান, অবস্থা এমন হয়েছে যে সাগর থেকে মাছ ধরে আন্ধার মানিক মোহনায় ঢুকতে গেলে এখন সমস্যা হয়। সাগর থেকে প্রায় পশ্চিম দিকে ৪/৫কিলোমিটার ঘুরে ফাতড়ার বনের কিনার থেকে থেকে বোট চালিয়ে মহীপুর আসতে হয়। জেলে আলমগীর দাবি করেন সিডরের বছরে যেন বেশি বেশি চর জেগে উঠেছে। এদের মন্তব্য সিডর আইলার পরে সাগরের মধ্যে বেশি বেশি চর জেগে উঠেছে। যেন গতি প্রকৃতি পর্যন্ত পাল্টে গেছে।
মহীপুর আলীপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গাজী ফজলুর রহমান জানান, সমুদ্র বক্ষে এতো বেশি চর জেগেছে যে বর্ষায়ও তাড়াতাড়ি কিনারে আসা যায় না।
তিনি বলেন, ‘এখন ভাটার সময় সাগর থেকে মহীপুরে আসতেই সমস্যা হয়। তারপরও মাছ ধরে কিনারে ফিরতে সময় অনেক বেশি লাগে।’
তিনি আরও জানান, যে আগে মহীপুর আলীপুর থেকে বোট ছেড়ে ৪/৫ ঘন্টা সাগরে চালালে ৫ বাম পানিতে (১৫হাত গভীর) জাল ধরা যেত। আর এখন ১০/১২ ঘন্টা বোট চালানোর পরেও ওই পরিমান গভীর সাগরে পৌছানো যায় না।
কলাপাড়া থেকে মৌডুবি রুটে চলাচলকারী একতলা লঞ্চের সুকানি মনির মিয়া জানান, আগে আগুনমুখা নদী পার হতে সোজা উত্তাল ঢেউ পার হয়ে লঞ্চ চালাতে হতো। আর এখন চরের কারণে লঞ্চ চালানো যায় না। ধীরে ধীরে চালাতে হয়। এমনকি আগুনমুখা নদী পরিণত হয়েছে মরা নদীতে। ভাটার সময় অপরিচিত সারেং কিংবা সুকানির লঞ্চ চালাতে সমস্যা হবে। মোটকথা রাবনাবাদ-আগুনমুখার মোহনাসহ সাগরের সর্বত্র অসংখ্য চর জেগে ওঠায় এখন নৌপথ বন্ধ হওয়ার পথে। এখন চরের কারণে এমন সমস্যা হচ্ছে যে, ঝড় জলোচ্ছ্বাসের সময় কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগর বক্ষে মাছ শিকার করা জেলেদের নিরাপদে দ্রুত আশ্রয় নেওয়ার জন্য উপকূলের আন্ধার মানিক মোহনা ছাড়া অন্য কোন পথ নেই । তাও প্রবেশপথ ভরাট হয়ে গেছে। জেলেদের দাবি সাগরে যেভাবে চর জাগতে শুরু করেছে তাতে ভবিষ্যতে ইলিশ আহরণের ক্ষেত্র পর্যন্ত পাল্টে যাচ্ছে। আর মহিপুর-আলীপুর মৎস্য বন্দরে ট্রলার আসা-যাওয়া বন্ধের উপক্রম হয়েছে।









