প্রতিষ্ঠার ৫৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বরগুনার আমতলী সরকারি কলেজে নেই কোনো কার্যকর ছাত্রাবাস। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। কেউ দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে কলেজে আসছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে আমতলী শহরের বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন মেসে থেকে পড়াশোনা করছেন। এতে একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাকার্যক্রম, অন্যদিকে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ। এ অবস্থায় কলেজটিতে দ্রুত ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
জানা গেছে, ১৯৬৯ সালে তৎকালীন এমপিএ ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী আলহাজ মরহুম মো. মফিজ উদ্দিন তালুকদার আমতলী সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লেখাপড়ার মান ও ভালো ফলাফলের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে সুনাম অর্জন করে। ফলে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হতে থাকেন।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যার কথা বিবেচনা করে ১৯৭২ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসের পশ্চিম পাশে ৪০ আসনবিশিষ্ট একটি টিনশেড ছাত্রাবাস নির্মাণ করে। তবে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী সেখানে থাকার সুযোগ পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে আমতলী শহরের বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন মেসে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হতো তাদের।
এদিকে পর্যাপ্ত ছাত্রাবাসের অভাব ও যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শত শত শিক্ষার্থীকে দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে কলেজে আসতে হতো। এতে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণসহ স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হতো বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা সমাধানে নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে নির্মিত ৪০ আসনের ছাত্রাবাসটি দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় প্রথমে এর দরজা-জানালা খুলে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব এবং ২০১৫ সালের দিকে বর্ষা মৌসুমের এক রাতে সেটি ধসে মাটিতে পড়ে যায়। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর সম্প্রতি শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে টিনশেড ভবনটি সংস্কার করে শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হলরুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ছাত্রাবাস হিসেবে এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে।
কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিন বছর আমতলী কলেজ ছাত্রাবাসের সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। তখন ছাত্রাবাসে কোনো আসন খালি থাকত না। দূর-দূরান্তের অনেক শিক্ষার্থী ছাত্রাবাসে থেকেই পড়াশোনা করত। তখন লেখাপড়ার মানও অনেক ভালো ছিল। ছাত্রাবাসটি ভেঙে যাওয়ার পর সংস্কার না করায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নির্বিঘ্ন করতে দ্রুত কলেজে দুটি নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণ করা জরুরি।’
কলেজের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে আমতলী সরকারি কলেজে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। তাদের একটি বড় অংশ দূর-দূরান্ত থেকে কলেজে আসেন। অনেকেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পায়ে হেঁটে ক্লাস করেন। আবার অনেকে শহরের বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন মেসে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে আবাসন ব্যয়ের পাশাপাশি অন্যান্য খরচও বেড়ে যাচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছেন না।
কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আলিফ বলেন, ‘কলেজে কোনো ছাত্রাবাস না থাকায় আমার মতো দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন কষ্ট করে ক্লাস করতে হয়। এতে আমাদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। শহরে মেস বা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার সামর্থ্য আমার ও আমার পরিবারের নেই। ছাত্রাবাস না থাকায় গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী আমার মতো দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।’
একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া, সুভা ও আবদুল্লাহ বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে স্বল্প খরচে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য দুটি আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ আরও ভালো হবে।’
উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. ইমরান খান বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমতলী সরকারি কলেজে দুটি ছাত্রাবাস নির্মাণ করা একান্ত প্রয়োজন। গরিব ও দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
আমতলীর কৃতী সন্তান ও সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ আবদুল মজিদ মল্লিক বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী আমতলী সরকারি কলেজে কোনো ছাত্রাবাস নেই, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সাধারণ, গরিব, অসহায় ও দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারপ্রধানের কাছে দুটি ছাত্রাবাস (ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক) নির্মাণের জোর দাবি জানাই।’
আমতলী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘আমিও একসময় এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম। বর্তমানে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছি। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কলেজে ছাত্রাবাস থাকা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ, গরিব, অসহায় ও দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে এ কলেজে ছাত্রাবাস নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, আবাসন সংকট নিরসনে দ্রুত আমতলী সরকারি কলেজে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হোক। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার পথ আরও সহজ হবে।









