বরগুনার আমতলী উপজেলার গাজীপুর বন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মোঃ শাহিন মাহমুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দূর্নীতি ও অর্থ আত্নসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে|
পটুয়াখালী দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী এবং স্থাণীয় বেশ কয়েকজন অভিভাবকরা লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করেন|
বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের পক্ষে মোঃ নাসির উদ্দীন এবং স্থানীয় অভিভাবকদের পক্ষে আঃ বাতেন দেওয়ান, মোঃ নুরুজ্জামান শিকদার ও মোঃ নজরুল ইসলাম ওই অভিযোগপত্র দাখিল করেন|
দুদকে দেওয়া অভিযোগত্র থেকে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের অভ্যান্তরীন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষকদের কাছ থেকে জোর করে রেজ্যুলেশন খাতায় ¯^াক্ষর নেয়া, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি নেওয়া, বিদ্যালয় চলাকালীন কোর্চিং করানো, সরকারী অনুদানের পাঁচ লক্ষ টাকার মধ্যে অর্ধেক টাকা স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষকদের না জানিয়ে ব্যয় করা, বিদ্যালয়ের সকল প্রকার রেজিষ্ট্রেশন ও ফরম পূরণে বোর্ড নির্ধারিত ফি-এর চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে তা বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা না দেওয়া|
সরকারি নিয়মানুসারে বিদ্যালয়ের সকল ব্যাংক হিসাব প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-এর যৌথ ¯^াক্ষরে পরিচালিত হওয়ার কথা| কিন্তু তিনি তা না করে তার পছন্দসই একজন শিক্ষককে নিয়ে হিসাব পরিচালনা করছেন এবং ইচ্ছামতো টাকা তুলে তা ব্যয় করছেন|
অভিযোগে আরো উল্লেখ আছে, বিদ্যালয়ের টিউশন-ফি এর টাকা শিক্ষক- কর্মচারীদের মাঝে সঠিকভাবে বণ্টন না করে বিগত দুই বছর ধরে বণ্টনে তিনি তালবাহানা করছেন| এছাড়া বিগত বছরে সাবেক সভাপতির ¯^াক্ষর জাল করে ৯০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন| এছাড়া সম্প্রতি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করে তার মধ্য থেকে বিদ্যালয় তহবিলে ৯০ হাজার টাকা জমা দিয়ে বাকী ৩০ হাজার টাকা তিনি নিজে রেখে দিয়েছেন| বর্তমানে বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসেবে গচ্ছিত ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্য থেকে ১ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন বলে জানা গেছে|
বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি মরহুম আব্দুর রব মিয়া দুই লাখ টাকা প্রদান কওে বিদ্যালয়ে দাতা সদস্য হয়েছিলেন| সেই টাকার কোন হদিস নেই| নিয়মবহির্ভূত ভাবে ফরম পুরনের সময় প্রবেশপত্র, মার্কশীট, সনদপত্রের ফি নেওয়া হয়| পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ছুটির আগে বা পরে পড়ানোর নিয়ম থাকলেও এরমধ্যে ভালো শিক্ষার্থীদেরও প্রতি বিষয়ে ১ হাজার করে টাকায় কোর্চিং করাতে বাধ্য করা হচ্ছে| কোর্চিংয়ের আয়ের ১০% বিদ্যালয় ফান্ডে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি তা আজ পর্যন্ত জমা দেননি|
এছাড়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজে কোর্চিং-এ না পড়িয়েও প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে নিয়েছেন| বিদ্যালয়ের বিভিন্ন আসবাবপত্র, বেঞ্চ, প্রিন্টার ইত্যাদি সরঞ্জাম তিনি নিজের বাসায় নিয়ে ইচ্ছেমত ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে|
এছাড়া ২০২৫ সালে দুদক পটুয়াখালী কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়ের ‘সততা স্টোর’-এর জন্য প্রদত্ত ২৫ হাজার টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের না জানিয়ে তিনি নিজের কাছে রেখেছেন| শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ফাঁকা রেজ্যুলেশন বইয়ে ¯^াক্ষর নেওয়া হয় এবং ৮ থেকে ১০টি রেজ্যুলেশন বই বেআইনিভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে|
সরকারি নিয়মে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা হাতে রাখার বিধান থাকলেও তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা হাতে রেখে দিচ্ছেন| ভর্তি নীতিমালায় ৫০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১ হাজার ৪ শত টাকা করে আদায় করা হচ্ছে এবং মোট কত টাকা আদায় হয়েছে তার কোনো হিসাব আজ পর্যন্ত তিনি দেননি|
এমনকি একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের বাসায় বসে ভর্তি করানো হয়| বাছাই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলেও বিদ্যালয় তহবিলে সেই টাকা কখনও জমা দেওয়া হয় না| এমনকি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজের দুর্নীতি ঢাকতে তিনি সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ¯^াক্ষর জাল করে একাধিক রেজ্যুলেশন ও ভাউচার ˆতরি করেছেন বলেও এমন অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে|
২০২১ সালে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে নিজের আপন ভাইকে দিয়ে হাইকোর্টে মামলা করিয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি বহাল রাখেন| এছাড়া তিনি নিজে এনটিআরসি কর্তৃক অনুষ্ঠিত প্রধান শিক্ষক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে হাইকোর্টে মামলা করে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি এখন পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছেন|
প্রতি বছর সরকার বিদ্যালয়ে গাছ লাগানোর জন্য ৫ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে থাকে| উক্ত টাকা দিয়ে গাছ না লাগিয়ে তিনি তা আত্বসাৎ করেছেন| এমনকি প্রতি শিক্ষা বছরে বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীদের নিজ নাম, পিতার নাম ও মাতার নামে ইচ্চাছাকৃত ভুল করে তারপর সেই ভুলগুলো সংশোধনের জন্য কৌশলে শিক্ষার্থী ও অভিভবাকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে নিচ্ছেন|
স্থাণীয় অভিভাবকদের পক্ষে দুদকে অভিযোগ দেওয়া আঃ বাতেন দেওয়ান, মোঃ নুরুজ্জামান শিকদার ও মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহীন মাহমুদ এর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দূর্নীতি ও অর্থ আত্নসাতের অভিযোগে আমরা পটুয়াখালী দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছি| তদন্তে তার সত্যতা প্রমাণিত হবে| আমরা চাই এই অসৎ প্রধান শিক্ষকের বিচার হোক আর বিদ্যালয়টিতে ভালো পাঠদান হোক|
বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের পক্ষে অভিযোগ দেয়া মোঃ নাসির উদ্দীন বলেন, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহীন মাহমুদ এর বিরুদ্ধে দুদকে দেওয়া সকল অভিযোগ সঠিক| নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সকল অভিযোগের সত্যতা মিলবে|
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গাজীপুর বন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহীন মাহমুদ এর ব্যবহৃত মুঠোফোনে কল দিলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অ¯^ীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের কোন সত্যতা নেই, সবকিছুই ষরযন্ত্র|
আমতলী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিঃ) মোঃ টিপু সুলতান বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুদকে দেওয়া অভিযোগের কপি হাতে পেয়েছি| তদন্তে সত্যতা পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে|
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন. ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুদকে যে, অভিযোগ করেছে তার একটি কপি হাতে পেয়েছি| অভিযোগ অনুযায়ী সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে|#









