পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১০ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু রাইয়ানকে তার খালু মানুষরূপী নরপশু আল-আমিন কীভাবে হত্যা করেছে তার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। আদালতকে দেয়া স্বীকারোক্তি মতে, আলআমিন পুর্বপরিকল্পিতভাবেই রাইয়ানকে হত্যার প্রস্তুতি নেয়। হত্যার আগের রাতে সারারাত আল-আমিন জেগে থেকে ইয়াবা সেবন করেন। সকালে আজানের সময় ঘর থেকে বের হয়ে শালি রুমানাদের বাড়িতে যায়। চুপি চুপি পেছনের দিক থেকে দেখেন রুমানা ঘরের পিড়া লেপার কাজ করছে। দরজা খোলা থাকায় দেখতে পায় রাইয়ান তার বাবার কাছে ঘুমুচ্ছে। এক হাত দিয়ে রাইয়ান কোলে তুলে এক হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে অন্য হাতে বুকের সঙ্গে চেপে দ্রুত বের হয়ে নিজের বাড়ির দিকে যায়। বাড়ির একটু সামনে গ্রামের হেলালের বাড়ির পরিত্যক্ত ঘরে বাচ্চা রাইয়ানকে নিচেজ রাখে। তখন দেখে রাইয়ান নিথর। নড়াচড়া করছে না। আলআমিন ধারনা করেন রাইয়ান মারা গেছে। আবার হেলালের ঘর থেকে বের হয়ে এদিক-ওদিক রাস্তায় তাকিয়ে কাউকে না দেখে আবার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে। কোমর থেকে কাপড়ের ব্যাগ বের কওে রাইয়ানের মৃতদেহ ব্যাগের মধ্যে উল্টোভাবে ঢুকায়। এরপর ব্যাগের মুখ বেধে ফেলে। এরপরে হেলালের ঘরের টিনের ওপর প্রথমে রাইয়ানের মরদেহ ভর্তি ব্যাগটি রাখে আলআমিন। এরপর হেলালের পুকুরে নেমে গামছা পরে নিজেকে ভিজিয়ে নেয় আলআমিন; কারন কেউ দেখলে যেন বুঝতে পারে মাছ ধরে ফিরেছে। এরপর লাশের ব্যাগটা নিয়া আলআমিন নিজের বাড়ির পেছনে যায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে না দেখতে পেয়ে ব্যাগটি খালে ফেলে দেয়। ব্যাগটা না ডোবায় ফের খালে নেমে কচুরিপানার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে। সেখান থেকে উঠে টিউবওয়েলে গিয়ে হাত-পা ধুয়ে ঘরে গিয়ে পান আর সিগারেট খায় আলআমিন। আলআমিন স্বীকারোক্তিতে আরো বলেন, এরপরই অন্যান্যেও মতো খবর পায় রাইয়ান নিখোঁজ। এসব শোনার পরেও ঠান্ডা মাথায় ঘাতক আল-আমিন তার ছেলে ও ছেলে বউকে রাইয়ানকে খুজতে ওই বাড়িতে যেতে বলে। নিজেও যায়। শালি রুমানাকে বলে পুকুরে খোঁজার জন্য।
আলআমিন তার দেয়া স্বীকারোক্তিতে জানান, রুমানার বড় বোন তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম পাঁচ বছর ধরে বিদেশে থাকত। মোবাইলে পরিবারের সকলের সাথে কথা হতো কিন্তু বাড়িতে আসত না। এই ঝামেলা মেটানোর জন্য অনেকের কাছে গিয়েছেন। সবশেষ শালি রুমানার কাছে যায়। রুমানা উল্টো সমাধান না করে তার জুতা দিয়ে পেটাতে চায়। দুইবার জুতা দিয়ে আঘাতও করে। বলে দেয় আবারয দি ওই বাড়িতে যায় তাইলে পিছা দিয়ে পেটানোর হুমকি দেয়া হয়। তারপর মনের ক্ষোভ নিয়ে রুমানার ক্ষতি করার চেষ্টা করতে থাকি। ঘটনার আগে কয়েকবার শিশু সন্তান রাইয়ানকে নেওয়ার চেষ্টা করেন আল-আমিন। পারেননি। এরপওে শেষে রাইয়ানকে নিয়ে হত্যা করে খালে ফেলে রাখি। পাঁচদিনের পুলিশি রিমান্ড শেষে আল-আমিন আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এসব অকপটে স্বীকার করেছেন। বর্তমানে আল-আমিন জেল হাজতে রয়েছে।
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাপাড়া থানার এসআই মো. ফোরকান মিয়া জানান, আদালতের নির্দেশে ১৮ অক্টোবর প্রধান আসামি আলআমিনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। চারদিন শেষে হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তি দেয় আল-আমিন। তাকে ২১ অক্টোবর আদালতে সোপর্দ করা হয়। স্বীকারোক্তি শেষে বিজ্ঞ আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠিয়েছেন।
এদিকে দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এভাবে হত্যার ঘটনায় মা রুমানা বেগম এখন শুধু যাথাযথ বিচার দাবি করে আসছেন। রুমানার দাবি তার সন্তানকে ঘাড় মটকে, হাত-পা ভেঙে নৃশংসভাবে হত্যা শেষে কাপড়ের একটি বাজারে ব্যাগে ভর্তি করে কচুরিপানার নিচে খালে ফেলে দেয়। বাবা-ইয়াবা খোর আল-আমিন এমন নৃশংসতা চালায় শিশু রাইয়ানের ওপর। ওই খুনী ঘটনার দিন সকালে এমন বর্বর হত্যাকান্ডের পরও রাইয়ানের তাদের বাড়িতে বেলা ১১টা পর্যন্ত নিখোঁজ রাইয়ানকে খোঁজার ছলে মিসেছিল। এদিকে জেল হাজতে থাকা ঘাতক আল-আমিনের সহযোগী গডফাদারদের হুমকির কারণে নানা শঙ্কায় রয়েছেন মা রুমানা বেগম। তার অপর দুই সন্তান ১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রী তানহা, আট বছর বয়সী তাহিরা ও স্বামী কর্মজীবী স্বামী রাসেল খানের নিরাপত্তা নিয়ে অজানা শঙ্কায় রয়েছেন।
রুমানা জানান, ১৫ অক্টোবর যেদিন পুলিশ আল-আমিনকে আটক করে ওই রাতে তার গডফাদারখ্যাত (বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হওয়া একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য) এক ব্যক্তি তার কয়েক ক্যাডার নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় ঘরের সামনে দাড়িয়ে গালাগাল করে। বলা হয় আল-আমিনকে ছাড়িয়ে না আনলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বলেও শাসিয়ে যায়। এরপর থেকে এ পরিবারে এখন নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তারা চরম ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
রুমানা জানান, তার বোন জামাই হলেও আল-আমিন ছিল মাদকসেবী ও কারবারি। পেশাদার চোর। গুটাবাছা গ্রামের তিনটি টিউবওয়েলের বডি চুরি করে বিক্রি করেছে। মানুষের পানির পাম্প চুরি করেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপির পরিচয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর আগে সে ভাড়াটে মোটরসাইকেল চালক ছিল। রুমানার দাবি তার বোন ফিরোজার সঙ্গে ডিভোর্সের কারণে মূলত প্রচন্ড ক্ষীপ্ত হয়ে এমন নৃশংসতার মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে। বর্তমানে ওই বাড়ির সকল সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নিহত রাইয়ানের দাদি হালিমা বেগম জানান, তিন ছেলের দুই ছেলে বিয়ে করেছে। কারও ছেলে সন্তান নাই। তাই তার ছেলে নাতি রাইয়ানকে হারিয়ে যেন তারা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। হালিমার ভাষ্য, ‘কোন মানুষের এমন কাম করার কথা না। ও (আল-আমিন) মানুষ না, পশু। ওর এখন ফাঁসি চাই। কারণ আল-আমিন যদি আইনের ফাকফোকর দিয়ে বের হয় তাইলে পরিবারের অন্যদের ওপরও এমন সহিংসতা চালাবে।’
এর আগে নিখোঁজের ৫৩ ঘন্টা পরে ১৭ অক্টোবর ১০ মাসের শিশু রায়হানের মৃতদেহ বাড়ির পাশের খাল থেকে পুলিশ উদ্ধার করে। ওইদিন বেলা ১১টার দিকে স্থানীয়রা প্রথমে দূর্গন্ধ পাচ্ছিলেন। পরে কচুরিপানার মধ্যে ব্যাগটি দেখতে পায়। থানা পুলিশকে খবর দেয়ার পরে থানা পুলিশ শিশুটির মৃতদেহ উদ্ধার করে। বর্তমানে গুটাবাছা গ্রামসহ সর্বত্র এই ঘটনাটি আলোচিত রয়েছে। শিশুটির এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে পরিবার ও এলাকাবাসী ঘাতকের দ্রুত বিচার দাবি করেছে।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি খুব দুঃখজনক। আমরা গরুত্বের সঙ্গে দ্রুত মূল আসামিকে আটক করি। নিখোঁজের ৫৩ ঘন্টা পরে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আসামি বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এখন পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ওই পরিবারের কোন ধরনের নিরাপত্তা বিঘ্নের কারণ ঘটলে তাৎক্ষণিক থানায় অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে।









