পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা সদরের বাউফল সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নার্গিস আখতার জাহানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা রুজুর পর বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক-২) এসএম মোসলেম উদ্দিনের গতকাল সোমবারের (১৪ সেপ্টেম্বর) স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক নার্গিস আক্তার জাহানকে বদলি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বিমেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
এর আগে গত ২৫ আগষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি মাধ্যমিক-১ শাখার উপসচিব তানিয়া ফেরদৌসের স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে জানানো হয় তাঁর (নার্গিস আখতার) বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছে এবং তাঁকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অন্যত্র বদলি করার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়।
যে সব অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে : কাম্য যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে সহকারী শিক্ষক ইংরেজি পদে ১৯৯৯ সালে নিয়োগ লাভ করেছেন। ১৯৯৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক দুইজন স্নাতক ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগের কথা উল্লেখ আছে। এর মধ্যে একজন ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন নার্গিস আখতার জাহান। কিন্তু নার্গিস আখতারের দাখিলকৃত ১৯৯৩ সালের স্নাতক পাশের নম্বরফর্দ অনুযায়ী স্নাতকে ইংরেজি বিষয় নাই এবং স্নাতকে তিনি তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁর যোগদানপত্র অনুযায়ি তিনি ১৯৯৯ সালের ১ আগষ্ট ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি ২০১১ সালের ২১ ডিসেম্বর একই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। বিদ্যালয়টি ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সরকারিকরণ করা হয়।
১৯৯৫ সালের নিয়োগ বিধি অনুযায়ী যে বিষয়ে নিয়োগ হবে স্নাতকের পাঠ্য বিষয়ে অবশ্যই সেই বিষয় থাকতে হবে এবং সব শ্রেনিতে দ্বিতীয় বিভাগ থাকতে হবে।
তিনি (নার্গিস আখতার) বিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে থেকেছেন এবং সরকারিভাবে বাসাভাড়া পেয়েছেন। কিন্তু বাসাভাড়ার টাকা কর্র্তন না করে পূর্ণ ভাতাদি উত্তোলন করে নিয়েছেন।
ওই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি আ. রহিম গাজীর ছেলে মো. রাসেল গাজীকে চতুর্থ শ্রেণির চাকুরি দেওয়ার কথা বলে নার্গিস আখতারের ৭৫ হাজার টাকা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ সংক্রান্ত ও নানা অনিয়মের বিষয়ে ওই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি জিএম ফারুক ও সাবেক অভিভাবক মিজানুর রহমানের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন ইউএনও মো. বশির গাজী।
তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন : উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক কুমার কুন্ডু। অন্য দুই সদস্য ছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পার্থ সারথী দত্ত ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান।
যে কারণে বিভাগীয় মামলা : তদন্ত কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে প্রধান শিক্ষকের কাম্য যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সহকারী শিক্ষক ইংরেজি পদে নিয়োগ লাভ, বকেয়া ভাতাদি উত্তোলনের পর বাসা ভাড়ার টাকা কর্তন করা হয়নি এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ছেলের নিয়োগে টাকা লেনদেনের সত্যতা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ দলীয় প্রভাব বিস্তারের শক্তি : নার্গিস আখতারের বাবা ওয়াদুদ মিয়া ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এক ভাই মো. ফরহাদ হোসেন বাউফল পৌরসভা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আরেক ভাই অহিদুজ্জামান ডিউক ছিলেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক।
শিক্ষকদের হয়রানি : বিএনপি মতাদর্শের শিক্ষকের তকমা দিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক আলী আজম খানকে বহিস্কার করে ১৫ বছর পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সহকারী শিক্ষক মো. মফিজুর রহমানকে বহিস্কার করে ১৩ বছর পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আরেক সহকারী শিক্ষক মো. আবু ইউসুফকে ১২ টি শোকজ দেওয়ার পর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাঁরা বহিস্কারাদেশের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। পরে তাঁর (নার্গিস আখতার) সঙ্গে রফা করে যোগদান করেছেন।
সহকারী শিক্ষক মো. মনির মিয়াকে অন্যায়কে বহিস্কার করে প্রায় এক বছর পর্যন্ত বেতন বন্ধ রাখা হয়েছিল। সেই শোকে ওই শিক্ষক মারা গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর দাপটে তাঁরা ছিলেন অতিষ্ঠ। কারণে-কারণে তাঁদের হয়রানি করা হতো। এমনকি সরকারিভাবে বেতন এলেও তিনি (নার্গিস আখতার) স্বাক্ষর না দেওয়ায় এক শিক্ষক বেতন উত্তোলণ করতে পারেননি। তাঁকে বদলি করার খবর পেয়ে স্বস্তি পেয়েছেন, অনেক খুশি হয়েছেন।
অভিযোগকারী জিএম ফারুক হোসেন বলেন,তাঁর বদলির খবরে খুব খুশি হয়েছি। আশা করি বিভাগীয় মামলায় তাঁর অবৈধ নিয়োগ বাতিলসহ অবৈধভাবে ভোগকৃত সরকারি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার আদেশ হবে। জানি না তা দেখে যেতে পারবো কিনা!
বিভাগীয় মামলা ও বদলির আদেশের সত্যতা স্বীকার করে প্রধান শিক্ষক নার্গিস আখতার জাহান বলেন,‘ কখনও অনিয়ম করেননি। বিভাগীয় তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমানিত হবে। ‘কাম্য যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,নিয়োগ কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিলেন বলেই তিনি যোগদান করেছিলেন।দলীয় প্রভাবের অভিযোগ সত্য না।









