পরিশোধিত বিল পরের মাসে ফের যুক্ত, মিটার না দেখেই বিল তৈরির অভিযোগ; সংশোধনে অফিসে ঘুরতে হচ্ছে গ্রাহকদের
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পল্লী বিদ্যুতের ‘ভৌতিক বিল’ নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা। এক মাসে পরিশোধ করা বিদ্যুৎ বিল পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়া, প্রকৃত মিটার রিডিং না দেখে অনুমাননির্ভর বিল প্রস্তুত, নির্ধারিত সময়ে বিলের কাগজ হাতে না পাওয়া এবং ভুল বিল সংশোধনে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘোরার মতো নানা অভিযোগ উঠেছে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের বিরুদ্ধে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, এসব কারণে সেবার পরিবর্তে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। কেউ কেউ অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করার পর ভুলটি ধরতে পেরেছেন। আবার বিল সংশোধন বা অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ সমন্বয়ের জন্য অফিসে একাধিকবার যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
গ্রাহকদের ভাষ্য, জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করার পরও আগস্ট মাসের বিলের সঙ্গে অনেকের আগের মাসের পরিশোধিত বিল পুনরায় যুক্ত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় কোনো কোনো গ্রাহকের বিল দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয়েছে। বিলের কাগজ হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি নজরে এলে তারা অফিসে যোগাযোগ করে সমস্যার কথা জানতে পারেন।
মৎস্যবন্দর আলীপুরের ব্যবসায়ী মো. আবুল কালামের মিটার নম্বর ৫০০১৫৮০০৬। তাঁর আগস্ট মাসের বিল এসেছে ২ হাজার ৭৮৬ টাকা। গ্রাহকের দাবি, যাচাই শেষে প্রকৃত বিল হওয়ার কথা ১ হাজার ৩৬১ টাকা। একইভাবে গ্রাহক মিজানুর রহমানের মিটার নম্বর ০০২৫০৬৭৫। তাঁর আগস্ট মাসের বিল এসেছে ১ হাজার ৬৪০ টাকা; অথচ সংশোধিত হিসাবে বিল হওয়ার কথা ১ হাজার ২০৬ টাকা।
এভাবে জুয়েল ফরাজী, রহিম ফরাজী, মজিদ ফরাজীসহ শত শত গ্রাহকের বিলেও অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
পাঁচ মিটারের বিলেই অসঙ্গতি
মৎস্যবন্দর আলীপুরের মেসার্স সুফিয়া মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী হাজী মো. মহিবুল্লাহ বলেন, তাঁর দোকান, বাসা ও অফিসসহ মোট পাঁচটি বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে। আগস্ট মাসে প্রতিটি মিটারেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বিল আসে। চারটি মিটারের বিল পরিশোধ করার পর পঞ্চম মিটারের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি অস্বাভাবিক অঙ্ক দেখতে পান।
তিনি বলেন, বিলের কাগজ যাচাই করে দেখা যায়, জুলাই মাসের বিল পরিশোধ করা হলেও সেই বিলের অর্থ আগস্ট মাসের বিলের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে তাঁকে অফিসে এসে বিল সংশোধন করতে বলা হয়। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অফিসে গেলে বিল সংশোধন করে কমিয়ে দেওয়া হয়।
মহিবুল্লাহর দাবি, ইতোমধ্যে যেসব মিটারে অতিরিক্ত বা দ্বিগুণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে, সেসব অর্থ সরাসরি ফেরত না দিয়ে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা অফিস থেকে জানানো হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “ভুল যদি অফিসের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলো কেন? টাকা ফেরত না দিয়ে পরবর্তী মাসে সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে কেন? নিজের টাকা সমন্বয় করিয়ে নিতে একজন গ্রাহককে আবার অফিসে আসতে হবে—এটা কেমন গ্রাহকসেবা?”
মিটার না দেখেই বিল তৈরির অভিযোগ
শুধু পরিশোধিত বিল পুনরায় যুক্ত হওয়াই নয়, মিটার রিডিং নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে মিটারে থাকা প্রকৃত রিডিং অনুযায়ী বিল প্রস্তুত না করে অনুমাননির্ভর রিডিংয়ের ভিত্তিতে বিল তৈরি করা হয়। এতে কোনো মাসে তুলনামূলক বেশি আবার কোনো মাসে কম বিল আসে।
পরবর্তীতে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের হিসাবের পার্থক্য দেখা দিলে গ্রাহকদেরই তা নিয়ে অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। গ্রাহকদের মতে, মিটার রিডিং যথাযথভাবে সংগ্রহ ও যাচাই করা হলে এ ধরনের অসঙ্গতি অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব।
বিল হাতে পেতে দেরি, দিতে হয়েছে বিলম্ব মাশুল
এদিকে আগস্ট মাসের বিদ্যুৎ বিল গ্রাহকদের হাতে পৌঁছানো নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেক গ্রাহক বিলের কাগজ নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে, অর্থাৎ ৩০ আগস্ট হাতে পেয়েছেন। ফলে পরদিন বিল পরিশোধ করতে গেলে বিলম্ব মাশুল দিতে হয়েছে।
গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিল যদি নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে হাতে পৌঁছে, তাহলে সময়সীমার মধ্যে বিল পরিশোধের সুযোগ তারা কীভাবে পাবেন? বিল প্রস্তুত ও বিতরণে কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের বিলম্ব থাকলে তার দায়ভার গ্রাহককে বহন করতে হবে কেন?
এ নিয়ে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কয়েকজন গ্রাহকের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ নিয়ে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ছোটাছুটি
বিল-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গেলে গ্রাহকদের একাধিক টেবিলে ঘোরানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, একজন কর্মকর্তা অন্য কর্মকর্তার কাছে পাঠান, আবার অন্য টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যেতে বলা হয়। এতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সমাধান পাওয়া যায় না।
গ্রাহকদের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত অনেককে উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোস্তফা আমিনুর রাশেদের কাছেও যেতে হয়। কিন্তু সেখানেও অভিযোগের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর সমাধান না পাওয়ার দাবি করেছেন তারা।
বিল দেরিতে পৌঁছানোর বিষয়ে জানতে চাইলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিল বিতরণে দেরি করে থাকলে তাঁর কাছ থেকে টাকা আদায়ের কথা বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহকদের প্রশ্ন—যিনি বিল বিতরণে দেরি করেছেন, তাঁকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কি গ্রাহকের? গ্রাহক নিজেই যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে বের করেন, তাহলে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কী?
নতুন সংযোগ ও মিটার নিয়েও অভিযোগ
নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার স্থাপন নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএমের যোগসাজশে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। নতুন মিটার বা সংযোগ পেতে কেউ কেউ সরাসরি, আবার কেউ এ চক্রের মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে সংযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়রা এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চান গ্রাহকেরা
গ্রাহকদের মতে, বিদ্যুৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সেবা। তাই বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুত, মিটার রিডিং, বিল বিতরণ, বিল সংশোধন ও নতুন সংযোগ প্রদানের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি।
তাঁদের দাবি, বিল তৈরির আগে পূর্ববর্তী মাসের বিল পরিশোধের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত মিটার রিডিং নিশ্চিত করে বিল প্রস্তুত এবং নির্ধারিত সময়ের যথেষ্ট আগে গ্রাহকের কাছে বিল পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ভুল বা অতিরিক্ত বিলের ক্ষেত্রে গ্রাহককে দিনের পর দিন অফিসে ঘোরানোর পরিবর্তে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। ভুলবশত অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়া অথবা গ্রাহকের সম্মতি অনুযায়ী সমন্বয়ের ব্যবস্থা করারও দাবি রয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে পৃথক ‘গ্রাহক অভিযোগ ও নিষ্পত্তি ডেস্ক’ চালু করা হলে ভোগান্তি অনেকাংশেই কমতে পারে। সেখানে অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকলে গ্রাহকদের এক কর্মকর্তা থেকে অন্য কর্মকর্তার কাছে ছুটতে হবে না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোস্তফা আমিনুর রাশেদ বলেন, “সফটওয়্যারের সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ বিল বেশি হয়েছে। এটা ঠিক হয়ে যাবে।”
অতিরিক্ত বিল বা অন্যান্য অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, “যদি কেউ কোনো অনিয়ম করে থাকে, সেটা গ্রাহক বুঝে নেবেন।”
তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, শুধু সফটওয়্যারের ত্রুটির কথা জানালেই সমস্যার সমাধান হয় না। ভুল বিল শনাক্ত, সংশোধন এবং অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের যথাযথ নিষ্পত্তির জন্য কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ চান তাঁরা।
স্থানীয় গ্রাহকদের প্রত্যাশা, দ্রুত এসব অভিযোগের তদন্ত করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ‘ভৌতিক বিল’ ও বিলিং জটিলতার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।









