বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) টিএসসির আওতাধীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। একই সঙ্গে অযৌক্তিক নিবন্ধন ফি কমানোর দাবিতে রেজিস্ট্রার বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনগুলো। গত সোমবার (৩১ আগস্ট) নিবন্ধনের শেষ দিন হলেও এই ২২টি সংগঠন নিবন্ধন করেনি। তাদের দাবি, অযৌক্তিক ফি কমানো হলে তারা নিবন্ধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত ১৩ জুলাই সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের নামে একটি আদেশ জারি করে। ওই আদেশে বলা হয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাগজপত্রের সঙ্গে ১ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি সোনালী ব্যাংকের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মাধ্যমে জমা দিতে হবে। এই আদেশের পরপরই নিবন্ধন ফি না কমানো পর্যন্ত নিবন্ধন করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠনগুলো।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত হয় এবং ৭২তম সিন্ডিকেটে তা পাস হয়। ওই বিধিমালা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। নয় সদস্যের ওই কমিটি ১ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালে একবার সংগঠনগুলোর নিবন্ধনের নামে ১০০ টাকা করে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে নিবন্ধন কার্যক্রম আর এগোয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ৭২তম সিন্ডিকেটের জারিকৃত এ-সংক্রান্ত পরিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যৌক্তিকতা অনুযায়ী ফি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ২০২২ সালে যেখানে ১০০ টাকা ফি নেওয়া হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালে এসে কেন ১ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনগুলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে পারেন। সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশে সহায়তা করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ছিল অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সহযোগিতা করা। কিন্তু নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের নামে প্রশাসন সংগঠনগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। এমন চলতে থাকলে শিক্ষার্থীরা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহ হারাবেন বলেও মনে করছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সাংস্কৃতিক ফি হিসেবে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ফি কোথায় ব্যয় করে, তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সহযোগিতা করে না বলে জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
নিবন্ধন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সংগঠনগুলো হলো—বরিশাল ইউনিভার্সিটি কুইজ সোসাইটি, বরিশাল ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্ট কনজারভেশন সোসাইটি, বিইউ রেডিও, বরিশাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, বরিশাল ইউনিভার্সিটি বিজনেস ক্লাব, বরিশাল ইউনিভার্সিটি ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বরিশাল ইউনিভার্সিটি রিসার্চ সোসাইটি, পদাতিক, বরিশাল ইউনিভার্সিটি আইটি সোসাইটি, প্রথম আলো বন্ধুসভা, বাঁধন (ববি ইউনিট), বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম (ববি শাখা), বরিশাল ইউনিভার্সিটি সায়েন্স ক্লাব, সমকাল সুহৃদ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সেইভ ইয়ুথ বিইউ চ্যাপ্টার, বরিশাল ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট ক্লাব, ইউথ ইনডিং হাঙ্গার—বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল ইউনিভার্সিটি প্রেস ক্লাব, বরিশাল ইউনিভার্সিটি গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ক্লাবসহ আরও কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইউ রেডিওর সভাপতি নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আজ থেকে ৭-৮ বছর আগে সংগঠনগুলো টিএসসিতে একবার নিবন্ধন করেছিল। তখন আমরা ১০০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করেছিলাম। এখন নিবন্ধন নবায়নের জন্য ১ হাজার টাকা চার্জ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক সংগঠনগুলোকে কোনো ধরনের সুবিধা দেয় না। অন্যদিকে, নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা। হয়তো আগের নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ বা ৩০০ টাকা হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে ১ হাজার টাকা সংগঠনগুলোর জন্য একটি বাড়তি বোঝা তৈরি করছে। অনেক সংগঠন আছে, যারা নতুন এবং মাত্র যাত্রা শুরু করেছে। এক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা তাদের জন্য অনেক বড় বোঝা। তাই আমরা সব সংগঠন মিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।’
বরিশাল ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্ট কনজারভেশন সোসাইটির সভাপতি নাইমুর রহমান সজিব বলেন, ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই স্বেচ্ছাসেবী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আয়ের কোনো উৎস নেই। শিক্ষার্থীরা বাৎসরিক বা মাসিক চাঁদার মাধ্যমে সংগঠনগুলো পরিচালনা করে থাকেন। সেখানে সামাজিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অনেক বেশি এবং অধিকাংশ সংগঠনের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই আমি মনে করি, এই নিবন্ধন ফি কমিয়ে সাধ্যের মধ্যে আনা হোক। যেহেতু সামাজিক সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গলের জন্যই কাজ করে থাকে, সে কারণে কোনো নিবন্ধন ফি না রাখাই উচিত। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি যথাযথভাবে ভেবে দেখবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিবন্ধন কমিটির সদস্যসচিব ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক তরিকুল হক বলেন, ‘আমরা একটি স্মারকলিপি পেয়েছি। সেখানে অনেকগুলো যৌক্তিক বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের একটি কমিটি রয়েছে। এখন আহ্বায়ক এ বিষয়ে সভা ডাকলে সেখানে আলোচনা হবে। যেহেতু আবেদনপত্র দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’








