দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, উত্তাল সাগর ও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার উপকূলীয় এলাকার জেলে, ট্রলার মালিক ও মাছের আড়তদাররা। ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও সাগরে যেতে না পারায় মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরে এখন অনেকটা নীরবতা। ঘাটে বাধা রয়েছে শত শত মাছ ধরার ট্রলার। অনেক আড়তেও নেই মাছের আমদানি, নেই নিলামের হাঁকডাক।
জেলেরা জানান, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরার জন্য প্রস্তুতি নিলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বারবার ফিরে আসতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি ও খাবারসহ বিপুল অর্থ খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় লোকসানের বোঝা বাড়ছে।
মহিপুর ঘাটে নোঙর করে থাকা এফবি মা জননী-৯ ফিশিং ট্রলারের মাঝি আব্দুল করিম জানান, গত সাত দিন ধরে তারা মহিপুর ঘাটে অবস্থান করছেন। তাকে নিয়ে ট্রলারে ২২ জন জেলে রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পর আবহাওয়া খারাপ থাকায় প্রায় এক মাস বাড়িতে বসে থাকতে হয়েছে। এরপর মহিপুরে আসার ২৭ দিনের মধ্যে একবার সাগরে গিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন। ওইবার ৩২ মণ মাছ পেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার পর তিন-চারবার সাগরে গেলেও মাত্র দুইবার মাছ নিয়ে ফিরতে পেরেছেন। বাকি সময়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। এ পর্যন্ত তার প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। একেকবার সাগরে যেতে ৬-৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। প্রায় ২৮০ ক্যান বরফ, সাড়ে চার হাজার লিটার জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ট্রলার পরিচালনা করতে হয়।
২০০০ সাল থেকে মাঝি হিসেবে সাগরে মাছ ধরছেন আব্দুল করিম। তার ভাষ্য, গত তিন-চার বছর ধরেই মাছের পরিমাণ কমছে। তবে চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ। আগে তিন-চার ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে জাল ফেললেই ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ১২-১৪ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে ১২০-১৩০ মাইল গভীর সাগরে যাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা মেলে না।
তিনি বলেন, “এখন আর মাছ ভেসে বেড়ায় না, নিচে থাকে।” পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন এফবি রাফায়াত ট্রলারের জেলে তোফাজ্জেল হোসেন। তার দাবি, ইলিশের ভরা মৌসুমেও এবার মাছের দেখা নেই। আলীপুর-মহিপুর সংলগ্ন খাপড়াভাঙা নদীতে হাজারের বেশি মাছ ধরার ট্রলার নোঙর করে আছে। কেউ জাল সেলাই করছেন, কেউ ট্রলারে মেরামতের কাজ করছেন। মহিপুর বন্দরের অন্তত ৮০টি আড়তেও এখন মাছের আমদানি নেই বললেই চলে।
মাছ না থাকায় আড়তে নিলাম বন্ধ। লোড-আনলোড শ্রমিকরাও বেকার সময় কাটাচ্ছেন। মাছ বাছাইয়ের কাজে নিয়োজিত পুরুষ ও নারীসহ তিন শতাধিক শ্রমজীবী মানুষও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক জেলে জানান, ধার-দেনায় তারা এখন প্রায় কাহিল হয়ে পড়েছেন। সংসারের খরচ চালাতে মহাজনদের কাছ থেকেও আর আগের মতো অগ্রিম টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।
মহিপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির সহসভাপতি রাজু আহমেদ রাজা জানান, চলতি মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি আড়তে গড়ে ৩০০-৪০০ মণের বেশি ইলিশ আমদানি হয়নি। অথচ তিন-চার বছর আগেও একই সময়ে অন্তত এক হাজার মণ ইলিশ আসত।
তিনি বলেন, সাগরের দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়া যেন থামছেই না। মাঝারি ধরনের ফিশিং ট্রলারে ভাসা জাল ফেলেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তার জন্যও বড় জাল নিয়ে ৮০-৯০ হাত গভীর পানিতে যেতে হচ্ছে। কিন্তু উত্তাল ঢেউয়ের কারণে অনেক ট্রলারই সাগরে টিকতে পারছে না। ফলে খালি হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে। এতে খরচ কমার বদলে ক্রমেই বাড়ছে।
মহিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী মো. ফজলু গাজী বলেন, “অবরোধের পর থেকেই সবকিছু এলোমেলো। সাগর উত্তাল হয়ে আছে। হাজার হাজার নৌকা ঘাটে বাধা। তিন-চারবার সাগরে গিয়েও কেউ টিকতে পারেনি। প্রচণ্ড ঢেউয়ের কারণে ফিরে আসতে হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে একটানা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ভয়াবহ লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। টানা ২০-২২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে সঠিকভাবে বরফ উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। ফলে মহিপুর-আলীপুর এলাকায় অন্তত ৩৫টি বরফকলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
ফজলু গাজীর ভাষ্য, এমন কোনো ট্রলার মালিক নেই যার গড়ে তিন-চার লাখ টাকা লোকসান হয়নি। সামনে আশ্বিন মাসে ইলিশের মূল মৌসুমও শেষের দিকে চলে আসবে। ফলে জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, “সাগরে মাছ আছে কি না, সেটাও বুঝতে পারছি না। আবহাওয়া খারাপ থাকায় জালই ফেলা যাচ্ছে না। গত বছর এ সময় মহিপুর-আলীপুর বন্দরে ইলিশের প্রচুর আমদানি ছিল।”
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ বছর জেলেদের ইলিশ আহরণে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এতে তাদের লোকসানও ক্রমেই বাড়ছে। তবে সাগর শান্ত হলে জেলেরা ঠিকমতো জাল ফেলতে পারলে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়ার আশা রয়েছে।








